Thursday, October 22, 2015

মাওলানা মওদূদী এর ভ্রান্ত (???) আকিদা সমূহ - বিস্তারিত ও প্রমাণ সহ

আমাদের দেশের প্রায় সকল আলেম উলামাগন একমত যে মওদূদীবাদ একটি ভ্রান্ত আকিদা

মওদুদী আল্লাহ ও রাসুল বিরোধী কথা বার্তা বলেছেন এবং সেগুলো বিশ্বাসও করতেন। 
এখানে আলেম ওলামা বলতে
            -কওমী আলেম
            -বেলেরভী আলেম
            -কতিপয় আহলে হাদিস আলেম

এবার জেনে নেই তাদের মতে মওদূদীর আকিদা সমূহঃ
১. জেনার কারনে শাস্তি দেয়া জুলুম
২. নবীগন নিষ্পাপ ছিলেন না
৩. সাহাবায়ে কিরামদের সম্পর্কে খারাপ ধারনা পোষণ করা
৪. কুরআন কারিম হেদায়াত গ্রন্থ নয়
৫. রাসুল (সা) এর কাজকে সুন্নাহ মনে না করা
৬. দাঁড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ এর ব্যপারে শরিয়ত বিরোধী ব্যাখ্যা
৭. আল্লাহর ফেরেশতাদের  দেব দেবীর তুলনা দেয়া
৮. নামাজ, রোজা, ইত্যাদি দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত না

এছাড়া তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আছে
১. তিনি কোন আলেম ছিলেন না
২. তিনি মাযহাব মানার বিরোধিতা করতেন
৩. শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং প্রচার করতেন।
৪. জীবনের শেষ বয়সে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধীতা করেছেন
৫. তিনি ব্রিটিশ সরকারের এজেন্ট ছিলেন
৬. দেশে হাংগামা ও গৃহযুদ্ধের মূল হোতা ছিলেন
৭. তিনি তাসাউফ বিরোধী ছিলেন 


পরবর্তি পোস্ট সমূহের মাধ্যমে তাঁর আকিদা সমুহের প্রমাণ এবং অভিযোগ গুলো খন্ডন করা হবে। 






















(পর্ব-১) দাঁড়ি সম্পর্কে মাওলানা মওদূদীর অভিমত ও বিশ্লেষণ

প্রথমেই বলে রাখি শুধুমাত্র তর্ক করা বা ভুল ধরার উদ্দেশ্য যদি পোস্টটী পড়েন তাহলে ভুল করবেন। 
এখানে শুধুমাত্র গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতে পারে। তাছাড়া অনুরোধ থাকবে সম্পূর্ন পোস্ট পড়ার পরই মন্তব্য করবেন। 

আমরা ধাপে ধাপে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। 
১. দাঁড়ির ব্যপারে রাসুল (সা) ও সাহাবাদের আমল, নির্দেশনা।
২. তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে দাঁড়ির পটভূমি।
৩. দাড়ির ব্যাপারে মাওলানা মওদুদীর অভিমত।
৫. মাওলানার (মওদূদী) অভিমতের বিশ্লেষণ।
৪. তৎকালীন সময়ে মাওলানার অভিমতের ভিত্তিতে আলেমদের প্রতিক্রিয়া
৬. পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত

১. দাঁড়ির ব্যপারে রাসুল (সা) ও সাহাবাদের আমল, নির্দেশনা।
(কওমী ফতোয়া) 
عن ابن عمر  : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( خالفوا المشركين وفروا اللحى وأحفوا الشوارب  . وكان ابن عمر إذا حج أو اعتمر قبض على لحيته فما فضل أخذه
হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা কর। দাড়ি লম্বা কর। আর গোঁফকে খাট কর।
আর ইবনে ওমর রাঃ যখন হজ্ব বা ওমরা করতেন, তখন তিনি তার দাড়িকে মুঠ করে ধরতেন, তারপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩}
দাড়ি লম্বা রাখার ব্যাপারে হাদীসে বিভিন্ন শব্দ এসেছে। যেমন-
১-إعفاء اللحى [ইফা] সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৪৭৫
২- وأعفوا اللحى [উফু] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৪
৩-وَأَرْخُوا اللِّحَى [আরখু] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬২৬
৪-وَأَوْفُوا اللِّحَى [আওফু] সহীহ মুসলিম হাদীস নং-৬২৫
৫- وَفِّرُوا اللِّحَى [ওয়াফফিরু] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩
দাড়ি কেটে ফেলার নির্দেশ কোন হাদীসে নেই।
হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা কর। দাড়ি লম্বা কর। আর গোঁফকে খাট কর।
আর ইবনে ওমর রাঃ যখন হজ্ব বা ওমরা করতেন, তখন তিনি তার দাড়িকে মুঠ করে ধরতেন, তারপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩}
এখানে যদিও হজ্ব ও উমরার সময়ের কথা বলা হয়েছে ,কিন্তু মুহাদ্দিসীনরা বলেন তিনি তা সব সময়ই করতেন । এ ছাড়াও আবু দাউদ ও নাসাঈর বর্ণনায় ইবনে উমরের (রাঃ) হজ্ব ও উমরা ছাড়া অন্য সময়েও দাড়ি এক মুঠের বেশীটুকু কেটে ফেলার কথা রয়েছে।
(ফাতহুল বারীঃ খন্ড-১০ পৃঃ ৩৬২)
কোন হাদীসেই সরাসরি দাড়ি এক মুষ্ঠি পরিমাণ রাখার কথা উল্লেখ নেই , শুধুমাত্র লম্বা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরাম থেকে এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ি রাখা প্রামাণিত আছে । দাড়ি সম্পর্কিত হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী আবু হুরাইরা ইবনে উমর (রাঃ) প্রমুখ গণ দাড়ি এক মুষ্ঠি পরিমাণ রাখতেন । তাই এ ব্যাপারে তাঁদের আমল আমাদের জন্য দলীল । 

হযরত উমর (রাঃ) তো নিজেই এক ব্যক্তির দাড়ি ধরে এক মুঠের অতিরিক্ত অংশটুকু নিজেই কেটে দিয়েছিলেন । (ফাতহুল বারীঃ খন্ড-১০ পৃঃ ৩৬২)
উপরোক্ত দু’জন মহান সাহাবী ব্যতীত আবু হুরাইরা ,জাবির (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে ও দাড়ির এক মুঠের অতিরিক্ত অংশটুকু কেটে ফেলার কথা পাওয়া যায় । 

২. তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে দাঁড়ির পটভূমি। 
দাঁড়ির ব্যপারে লিখিত কোন দলীল না থাকলেও এ ব্যপারে সবাই একমত যে, মুসলিম পুরুষগন (বলা যায় আগের জমানায় যে কোন পুরুষগনই) দাঁড়ি রাখাকে পৌরষোত্বের প্রতিক মনে করতেন। সুতরাং কেউ যে দাঁড়ী কাটতে পারে তা কল্পনাই করতনা। 
ইংরেজরা উপমহাদেশে আসার পরই একদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু হয়। শিক্ষিত মুসলমানরা ইংরেজীয় পোশাক তথা "শার্ট প্যান্ট" পড়াও শূরু হয় অথচ তৎকালীন সময়ে এই পোশাকও হারাম বলেই ফতোয়া দিতেন আলেমরা। ছবি তোলাকেতো রীতিমত আতংক মনে করতেন তারা। আর ইংরেজী শিক্ষা করাও সর্বোসম্মতভাবেই নাজায়েজ ছিল। তাহলে চিন্তা করুন দাঁড়ি কাটাকে কি পরিমান ঘৃণা করতেন আলেমরা !!! 
অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা যে অল্পকয়েক মুসলিমরা গ্রহণ করেছিল তারা সবাই দাড়ি না রাখাই স্মার্টনেস মনে করে শেভ করা শুরু করল। 

৩. দাড়ির ব্যাপারে মাওলানা মওদুদীর অভিমত। 
তার অভিমত পরে বিশ্লেষণ করা হবে। তার আগে রাসায়েল মাসায়েল থেকে নেয়া দাড়ি বিষয়ে প্রশ্নত্তোর দেখে নেয়া যাক। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষনীয় যে প্রশ্নগুলা ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে করা হয়েছিল। 





৫. মাওলানার (মওদূদী) অভিমতের বিশ্লেষণ। 
* দাড়ি রাখার পরিমানের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদিসও নেই। 
* সাহাবারাও এ ব্যপারে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা দেননি। ৩-৪ জন সাহাবা ছাড়া জানাও যায়না সাহাবারা কতটুকু দাড়ি রেখেছেন।  
১. মাওলানা দাড়ি বিষয়টাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাননি বা তর্কে জড়াতে চাননি। 
২. যে যেমন ইচ্ছা দাড়ি রাখতে পারবে বলেছেন। তবে এক মুষ্টী উত্তম। দাড়ি বড় করা সর্বোত্তম। 
৩. তবে মতামত দিয়েছেন যে চাইলে এক মুষ্ঠী পরিমাণএর চেয়ে কম রাখতে পারবে যদি দাড়ি দেখে বুঝা যায় যে তিনি সুন্নাতের উদ্দেশ্যেই রেখেছেন। 
৪. অনিয়মিত দাড়ি বা যদি মনেহয় দাড়ি রাখেন না বা অনিয়মিত শেভ করেন, এমন দাড়ি রাখা যাবেনা। 
৫. উনি মাসালাটা দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে যারা দাড়িই রাখতে চান না বা রাখেন না। 
৬. যারা দাড়ি রাখেনই তাদেরকে দাড়ি ছোট করার জন্য বলেননই। 
৭. আর যে কেউই এ ব্যপারে ইখতিলাফ করতে পারবেন। তাছাড়া এ ব্যাপারে তামাম আলেমরাই একমত যে ২ ধরনের ইজতিহাদ হলে ২ টাই সঠিক। যদি ইজতিহাদ কারী ভুল করেন তাহলে পাবেন ১ গুন সওয়াব, আর যদি সঠিক হন তাহলে ২ গুন সওয়াব। 

৬. পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত 
১. সুতরাং দাড়ি ছোট রাখার ব্যপারে বাড়াবাড়ি করা যাবেনা। রাসুল (সা) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমল দেখিয়ে ও শিখিয়ে ও বলে দিয়েছেন। অনেক ছোট ছোট বিষয়ো বাদ যায়নি যেমন, কিভাবে খেতে হবে, কথা বলতে হবে, গোসল করতে হবে, এমনকি ইস্তিঞ্জার নিয়মও বিস্তারিত বলে গেছেন। 
তাছাড়া উম্মতদের মাঝে ভবিষ্যতে কি ধরনের ফিতনাহ আসতে পারে তাও সতর্ক করে গেছেন। দাড়ির পরিমান জিনিসটা যদি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হত তাহলে নিশ্চয় এ বিষয়ে একবার হলেও বলে যেতেন যে কতটুকু পরিমানের কম দাড়ি রাখা যাবেনা। বরং দাড়ি রাখাটাই গুরুত্বপূর্ন, তবুও ফরজও না। 
২. দাড়ি রাখা সর্বোসম্মতভাবে ওয়াযিব। 
৩. আরকটি বিশেষ ব্যপার লক্ষনীয় যে, তৎকালীন সময় হিসেবে উনি ফতোয়াটা দিয়েছিলেন যখন বর্তমানের মত দাড়ি বিভিন্ন স্টাইলে রাখাটা ফ্যাশন ছিলনা। সুতরাং সে সময়ে এই বিষয়টা নিয়ে আলেমরাও তেমন বাড়াবাড়ি করেননি এখনকার আলেমরা যতটা বাড়াবাড়ি করছেন। ১৯৪৪-৪৫ সালের দিকে প্রায় সব আলেমের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল মওদুদীর। এমনকি দেওবন্দী অনেক বড় আলেমও তার সাথে দ্বীনের কাজ করে গেছেন। 
৪. সর্বোশেষে এটাই বলা যায়, যেহেতু দাড়ি এখন মুশরিদের একটা ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে; যেহেতু মুশরিকদের বিরোধীতা করাই দাড়ি রাখার মূল উদ্দেশ্য; সুতরাং এক মুষ্টী পরিমাণ রাখাই উত্তম; অথবা এমন ভাবে রাখতে হবে যাতে সুন্নাহের উদ্দেশ্য বুঝা যায়;  স্টাইল করে দাড়ি রাখা সুন্নাতের বরখেলাফই না বেয়াদবীও বটে। 
আমার মনেহয় মাওলানা মওদুদী (রহ) আজ বেচে থাকলে, এরকম ফিৎনা করার চেয়ে নিজের মতামতই উঠিয়ে নিতেন। 

আল্লাহ সব জানেন। আমাদের ভুল ত্রুটী ক্ষমা করুন। আমীন। 







বিষয়ভিত্তিক মাওলানা মওদূদীর গ্রন্থপঞ্জী

অনুদিত বাংলা বইয়ের নামপৃষ্ঠামূল উর্দু বইয়ের নামপ্রকাশকাল
ক. কুরআন   
১. তরজমায়ে কুরআন মজীদ১২৪৮তরজুমায়ে কুরআন মজীদ১৯৭৩ ঈসায়ী
২. তাফহীমুল কুরআন ১-১৯ খণ্ড৪১৬৫তাফহীমুল কুরআন ৬ জিলদ১৯৪৩-১৯৭২
৩. তাফহীমুল কুরআনের বিষয়সূচি৫৪০মাওয়ুয়াতে কুরআনী
৪. কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা১১৯কুরআন কী চার বুনয়াদী ইসতেলার্হী১৯৪১ ঈসায়ী
৫. কুরআনের মর্মকথা৪৮মুকাদ্দামায়ে তাফহীমুল কুরআন
খ. হাদীস/ দুরূহ
৬. সুন্নাতে রাসূলের আইনগত মর্যাদা৩৩৬সুন্নত কী আইনী হাইসিয়ত১৯৬৩ ঈসায়ী
৭. কুরআনের মহত্ত্ব ও মর্যাদা১৩৩ফাযায়েলে কুরআন (হাদীস কী রোশনী মেঁ)১৯৭৭ ঈসায়ী
গ. ইসলামী জীবন দর্শন
৮. ইসলামী পরিচিতি১১২রিসালায়ে দ্বীনীয়াত১৯৬৩ ঈসায়ী
৯. তাওহীদ রিসালাত আখিরাত৪৪তাওহীদ রিসালাত আওর যিন্দেগী বা’দ
১০. ইসলামের জীবন পদ্ধতি৫৫ইসলাম কা নেযামে হায়াত১৯৪৮ ঈসায়ী
১১. একমাত্র ধর্ম৪৫দ্বীনে হক১৯৪৩ ঈসায়ী
১২. শান্তি পথ২৭সালামতী কা রাস্তা১৯৪২ ঈসায়ী
১৩. ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা২৭৯ইসলামী তাহযীব আওর উসকে উসুল ওয়া মুবাদী১৯৩৩ ঈসায়ী
১৪. নির্বাচিত রচনাবলী ১-৩ খণ্ড১৩৪৪তাফহীমাত ১-৩ জিলদ১৯৩৩-৩৮ ঈসায়ী
১৫. আল জিহাদ৫৯২আল জিহাদু ফিল ইসলাম১৯২৮ ঈসায়ী
১৬. ইসলাম ও জাহেলিয়াত৪৮ইসলাম আওর জাহেলিয়াত১৯৪১ ঈসায়ী
১৭. ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব২২৮তানকীহাত১৯৩৩-৩৮
১৮. ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মৌলিক রূপরেখা৩৮৪ইসলামী নেযামে যিন্দেগী আওর উসকে বুনয়াদী তাসবিরাত
১৯. ইসলামী দাওয়াতের দার্শনিক ভিত্তি৩২ইসলাম আওর মাগরিবী লা দ্বীনী জমহুরিয়ত
২০. ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিকোণ৩২ইসলাম কা আখলাকী নোকতায়ে নযর১৯৪৪ ঈসায়ী
২১. ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ১১৯মাসয়ালায়ে কাওমিয়াত১৯৩৯ ঈসায়ী
২২. ইসলাম ও সমাজতন্ত্র১৯৪৫ ঈসায়ী
২৩. ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার২৪ইসলাম আওর আদলে ইজতেমায়ী
২৪. ইসলামে শক্তির উৎস৬৭ইসলাম কা ছের চশমায়ে কুঅত
২৫. কুরবানীর শিক্ষা৪৮ইসবাতে কুরবানী বিআয়াতে কুরআনী
২৬. ঈমানের হাকীকত৪৮হাকীকতে ঈমান১৯৩৮ ঈসায়ী
২৭. ইসলামের হাকীকত৪৪হাকীকতে ইসলাম১৯৩৮ ঈসায়ী
২৮. নামাজ রোযার হাকীকত৬৫হাকীকতে সাওম আওর সালাত১৯৩৮ ঈসায়ী
২৯. হজ্জের হাকীকত৪৮হাকীকতে হজ্জ১৯৩৮ ঈসায়ী
৩০. যাকাতের হাকীকত৫৮হাকীকত যাকাত১৯৩৮ ঈসায়ী
৩১. জিহাদের হাকীকত২৮হাকীকতে জিহাদ১৯৩৩ ঈসায়ী
৩২. তাকদীরের হাকীকত১০২মাসয়ালায়ে জবর ওয়া কদর১৯৩৩ ঈসায়ী
৩৩. তাকওয়ার হাকীকতহাকীকতে তাকওয়া১৯৪৭ ঈসায়ী
৩৪. শিক্ষা ব্যবস্থাঃ ইসলামী দৃষ্টিকোণ১৩৩তা’লীমাত১৯৪১ ঈসায়ী
৩৫. শিরকের হাকীকতহাকীকতে শিরক১৯৪৪ ঈসায়ী
৩৬. তাওহীদের হাকীকতহাকীকতে তাওহীদ১৯৪৫ ঈসায়ী
ঘ. আইন, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা
৩৭. ইসলামী আইন৬৩ইসলামী কানুন১৯৪৮ ঈসায়ী
৩৮. ইসলামী রাষ্ট্র৭০০ইসলামী রিয়াসত১৯৪৮ ঈসায়ী
৩৯. খেলাফত ও রাজতন্ত্র২৯৪খিলাফত ওয়া মুলুকিয়াত
৪০. ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ৬৩ইসরাম কা নযরিয়ায়ে সিয়াসী১৯৩৯ ঈসায়ী
৪১. উপমহাদেশের স্বাধীতা
আন্দোলন ও মুসলমান ১-২ খণ্ড৮৭৭তাহবীরকে আযাদী হিন্দ আওর মুসলমান ১-২ জিলদ১৯৩৮ ঈসায়ী
৪২. ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন৮৬ইসলামী দস্তুর কি দাতবীন
৪৩. ইসলামী শাসনতন্ত্রের মূলনীতি৮৬ইসলামী দসতুর কি বুনয়ার্দী
৪৪. মৌলিক মানবাধিকার৩২ইনসান কে বুনয়াদী হুকুম
৪৫. ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার৫০ইসলামী রিয়াসত মে জিম্মীযুঁ কী হুকুক১৯৪৮ ঈসায়ী
৪৬. দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক ইতিহাস২৮৬দাককিন কী সিয়াসী তারীখ
৪৭. কুরআনের রাজনৈতিক শিক্ষা৫৭কুরআন কী সিয়াসী তা’লীমাত
৪৮. জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র২১কাওমী ওয়াহদাত
৪৯. ইসলামী আইনে মুরতাদের শাস্তি৬৮মুরতাদ কী সাযা১৯৪৩ ঈসায়ী
ঙ. ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
৫০. ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি৪৭দাওয়াত ইসলামী আওর উসকা তারীক কার১৯৪৬ ঈসায়ী
৫১. জামায়াতে ইসলামীর দাওয়াতজামায়াতে ইসলামী কা দাওয়াত১৯৪৭ ঈসায়ী
৫২. ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন১২২তাজদীদ ওয়া ইহইয়ায়ে দ্বীন১৯৪০ ঈসায়ী
৫৩. জামায়াতে ইসলামীরজামায়াতে ইসলামী কা মাকসাদে
উদ্দেশ্য -ইতিহাস কর্মসূচী৮০তারীখ আওর লাযেহায়ে আ’মল১৯৫১ ঈসায়ী
৫৪. আল্লাহর পথে জিহাদ৩২জিহাদুন ফী সাবীলিল্লাহ
৫৫. ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি৬২তাহরীকে ইসলামী কী আখলাকী বুনিয়াদী
৫৬. ইসলামী আন্দোলন : সাফল্যের শর্তাবলী৬৪তাহরীকে ইসলামী কামিয়াবী কা শারায়েত
৫৭. মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচী৭৮মুসলমানুঁ কা মায়ী হাল মুসতাকবেল কে দিয়ে দায়েহায়ে আমল
৫৮. ইসলামী বিপ্লবের পথ৫৬ইসলামী হুকুমাত কিসতরাহ কায়েম হুতী হায়১৯৪০ ঈসায়ী
৩৯. ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী১৩৮তাহরীকে ইসলামী কা আয়েনদাহ লায়েহায়ে আমল১৯৪৭ ঈসায়ী
৬০. আন্দোলন সংগঠন কর্মী২২৪তাহরীক আওর কারে কুন
৬১. দায়ী ইলাল্লাহ দাওয়াত ইলাল্লাহ৪২দায়ী ইলামাহ দাওয়াত ইলাল্লাহ্
৬২. ভাঙ্গা ও গড়া৩২বানাও আওর বেগাড়১৯৪৭ ঈসায়ী
৬৩. একটি সত্যনিষ্ঠ দলের প্রয়োজন২৩এক সালেহ জামায়াত কী জরুরত১৯৪১ ঈসায়ী
৬৪. শাহাদাতে হুসাইন (রাঃ)১৬শাহাদাতে ইমাম হোসাইন (রা.)
৬৫. বিশ্ব মুসলিম ঐক্যজোট আন্দোলন৪৩ইত্তেহাদে আনমে ইসলামী
৬৬. সত্যের সাক্ষ্য৪০শাহাদাতে হক১৯৪৬ ঈসায়ী
৬৭. আজকের দুনিয়ায় ইসলাম৪২ইসলাম আসরে হাযের মেঁ
৬৮. জামায়াতে ইসলামীর উনত্রিশ বছর৫৪জামায়াতে ইসলামী কা ঊনত্রিশ সাল
চ. অর্থনীতি ও ব্যাংক ব্যবস্থা
৬৯. ইসলামী অর্থনীতি৩২৮মায়াশিয়াতে ইসলাম
৭০. অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান৩৮ইনসান কা মায়াশী মাসয়ালা আওর উসকা ইসলামী হল১৯৪১ ঈসায়ী
৭১. কুরআনের অর্থনৈতিক নির্দেশিকা৩৮কুরআন কী মায়া’শী তা’লীমাত
৭২. ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ১২৬ইসলাম আওর জাদীদে মায়া’শী নযরিয়াত
৭৩. ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি৩১ইসলামী মায়া’শিয়াত কে উসুল
৭৪. সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং৩০২সুদ১৯৩৬ ঈসায়ী
৭৫. ভূমির মালিকানা বিধান৯৬মাসয়ালায়ে মিলকিয়তে যমীন
৭৬. জাতীয় মালিকানাকওমী মিলকিয়ত১৯৫০ ঈসায়ী
ছ. দাম্পত্য জীবন ও নারী
৭৭. পর্দা ও ইসলাম২৮০পর্দা১৯৩৭ ঈসায়ী
৭৮. স্বামী স্ত্রীর অধিকার১৫১হুকুকুয যাওজাইন১৯৩৫ ঈসায়ী
৭৯. ইসলামী দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ১৩১ইসলাম আওর যবতে বেলাদাত১৯৩৬ ঈসায়ী
৮০. মুসলিম নারীর নিকট ইসলামের দাবী২৪মুসলিম খাওয়াতীন সে ইসলাম কে মুতালিবাত
জ. তাযকিয়ায়ে নফস
৮১. হিদায়াত৫৫হিদায়াত
৮২. ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা২৭৪খুতবাত১৯৩৮ ঈসায়ী
৮৩. ইসলামী ইবাদতের মর্মকথা৮৮ইসলামী ইবাদাত পর তাহকীকী নযর১৯৩৯
৮৪. আত্মশুদ্ধির ইসলামী পদ্ধতি৪৮তাযকিয়ায়ে নফস
ঝ. সীরাত
৮৫. সীরাতে সারওয়ারে আলম ১-৫ খণ্ড১২১৬সীরাতে সরওয়ারে আলম ১-২ জিলদ্
৮৬. খতমে নবুয়্যত৭৫খতমে নবুওয়াত
৮৭. নবীর কুরআনী পরিচয়৪০কুরআন আপনে লায়ে ওয়ালে কো কেসরং মেঁ পেশ করতা হায়
৮৮. আদর্শ মানব৩২সরওয়ারে আলম কা আসলী কারনামা
৮৯. সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা৪০মাকামে সাহাবা
ঞ. সামগ্রিক
৯০. রাসায়েল ও মাসায়েল ১-৫ খণ্ডরাসায়েল ওয়া মাসায়েল ১-৫ জিলদ১৯৪২-১৯৪৭
৯১. যুব সমাজের মুখোমুখি মাওলানা মওদূদী৪৫০তাসরীহাত
৯২. যুগ জিজ্ঞাসার জবাব ১-২ খণ্ড৪৪৮ইসতিফসালাত ১-২ জিলদ
৯৩. বিকেলের আসর ১-২ খণ্ড২৫০আসরী মাজালিস ১-২ জিলদ
৯৪. পত্রাবলী ১-২ খণ্ড৪৫৫মাকাতীব মাওলানা মওদূদী (র.) ১-২ জিলদ
৯৫. বেতার বক্তৃতা৮৭নশরী তাকরীরী
৯৬. খুতবাতুল হারামখুতবাতুল হারাম
৯৭. পত্রালাপ মাওলানা মওদূদী ও মরিয়ম জামিলামাওলানা মওদূদী আওর মরিয়ম জামিলা কে দরমিয়ান খত
৯৮. কাদিয়ানী সমস্যাকাদিয়ানী মাসয়ালাহ্১৯৫৩ ঈসায়ী
মাওলানা মওদূদী সম্পর্কে বাংলাভাষায় কয়েকটি বই
 বইয়ের নামলেখকের নাম
১.বিশ্বের মনীষীদের দৃষ্টিতে মাওলানা মওদূদীআব্বাস আলী খান সম্পাদিত
২.মাওলানা মওদূদীআব্বাস আলী খান
৩.আলেমে দ্বীন মাওলানা মওদূদীআব্বাস আলী খান
৪.ইসলামের পুনরুজ্জীবনে মাওলানা মওদূদীর অবদানঅধ্যাপক গোলাম আযম
৫.জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাসআব্বাস আলী খান
৬.জামায়াতে ইসলামীর কার্যবিবরণী- ১ম খণ্ড
৭.জামায়াতে ইসলামীর কার্যবিবরণী -২য় খণ্ড
৮.সত্যের আলোমাওলানা বশীরুজ্জামান
৯.কুরআনের দেশে মাওলানা মওদূদীমুহাম্মদ আসেম
১০.মাওলানা মওদূদীর বহুমুখী অবদানআব্বাস আলী খান
১১.জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার অন্তরালেআবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ
১২.আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের ভূমিকাজুলফিকার আহমদ কিসমতী
১৩.ছোটদের মওদূদীশেখ আনসার আলী
১৪.মাওলানা মওদূদীর বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাবমাওলানা আবদুল হাকীম
১৫.মওলানামওদূদীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তাত্ত্বিক পর্যালোচনামুফতী মুহাম্মদ ইউসুফ
১৬. খেলাফত ও রাজতন্ত্র গ্রন্থ সম্পর্কে অভিযোগের জবাববিচারপতি মালিক গোলাম আলী
১৭.মাওলানা মওদূদীকে যেমন দেখেছিঅধ্যাপক গোলাম আযম

অন্যান্যের দৃষ্টিতে মাওলানা মওদূদী

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সম্পর্কে অনেক বিজ্ঞ ও মনীষীগণের মন্তব্য রয়েছে, রয়েছে তার ঘনিষ্ঠজনের অনুভূতি যা অনেক শিক্ষণীয় এবং অনুসরণীয়। তার কিছু নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ

বেমম মওদূদী
মওদূদী সাহেব একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে কোরআন এবং নবী চরিত্রের যে মাহাত্ম্য দান করেছে, তাতে বিনা দ্বিধায় একথা বলা যায় যে, তাঁর প্রতিটি কার্যকলাপ কোরআন সম্মত।
“আমি ছিলাম গুমরাহ। মওদূদী সাহেব আমার সামনে উদিত হন সিরাতুল মুস্তাকীমের’ রাহবার হিসাবে। তিনি ছিলেন নির্বাক, কিন্তু তাঁর কার্যকলাপই প্রতিমূহূর্তে সত্য পথের দিকে অনুপ্রেরণা যোগাতো। যদি তিনি মুখ খুলতেন, আমার প্রত্যেক কাজে বাধা দিতেন এবং প্রতিটি বিষয়ে অঙ্গুলি নির্দেশ করতেন, তাহলে আমার সংশোধন তো দূরে কথা, তাঁর সাথে জীবন যাপন করাও আমার পক্ষে হয়তো সম্ভব হতো না। কিন্তু তা তিনি করেননি কোনদিন। এটাই ছিল তাঁর ইসলাম প্রচারের বিজ্ঞানসম্মত পন্থা, যা তিনি শিক্ষা করেছিলেন কোরআন পাক থেকে।
“তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, ধৈর্যশীল ও স্নেহশীল। আমার স্মরণ নেই যে, তিনি বিগত পনেরো বিশ বছর ‘অমর-বিল মারুফ’ ও ‘নাহী আনিল মুনফার’ সম্পর্কে আমার প্রতি কোন কঠোর আদেশ করেছেন কি না। তাঁর চরিত্রের মাধুর্যই এই যে, কিছুকাল তাঁর সংস্পর্শে থাকলেই তাঁর মনঃপূত হওয়া যায়।”
“মওদূদী সাহেব বাহ্যিক সংশোধন অপেক্ষা আধ্যাত্মিক সংশোধনের প্রতি অধিকতর দৃষ্টি রাখেন। একবার তিনি কোথা হতে এসে শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে শুয়ে পড়েন। এমন সময় আগন্তুক তাঁর সাথে দেখা করতে চাইলেন। আমি বললাম যে, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। একথা শুনে মওদূদী সাহেব শুধু এতটুকু বললেন, ‘তুমি মিথ্যা কথা বলে ফেললে’?”
“একবার আমরা সবাই এক সঙ্গে খেতে বসেছি। আমি বড় ছেলেকে বলছিলাম, ‘ব্যাটাৱ, নামায পড়ো। নতুবা লোকে বলবে মওদূদী সাহেবের ছেলে নামায পড়ে না’।”
“তিনি বললেন, দেখ ব্যাটা, যখন নামায পড়বে, তখন একমাত্র আল্লাহর জন্যেই পড়বে, পিতর জন্যে না।”
“সন্তানের প্রতি এত স্নেহশীল যে, এমনটি আর কাউকে দেখিনি। যখনই তিনি বাড়িতে আসেন, প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে ডাকতেন। দারুল ইসলামে আমাদের এক টাঙা ছিল। তিনি নিজেই আমাকে এবং ছেলেদের নিয়ে সন্ধ্যার আগে বেগাতে যেতেন। অন্য কারো সঙ্গে তাদের কখনো কোন সথানে পাঠাতেন না, পাছে কেউ হঠাৎ টাঙা থেকে পড়ে যায়। একবার কি কারণে কোচওয়ানের সঙ্গে ছেলেদের পাঠানকোট পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি নদীর ধারে বেড়াতে যান। মাগরিবের আগেই নদীর ধার থেকে ফিরে এসে জানতে পারলেন যে, ছেলেরা তখন্টো ফিরেনি। তখন তিনি বাড়ির ভিতরে না এসে বাইরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রইলেন। ছেলেরা ফিরে এলে, তবে তাদের নিয়ে তিনি ভেতরে এলেন।”
“সতেরো বছরবয়সে মওদূদী হাসেব পিতৃহীন হন। আল্লাহর অনুগ্রহে মা এখনও বেঁচে আছেন।” [বেগম মওদূদীর উপরোক্ত উক্তির পর ১৯৫৭ সালে মাওলানা মওদূদীর মাতা জান্নাতবাসী হন।]
“তিনি মায়ের এতদূর খেদমত করেন যে, এমন পুত্র সত্যিই বিরল। মায়ের কোন কিছু তাঁর মনঃপূত না হলে নীরব থাকেন। কোনরূপ বিরক্তিও প্রকাশ করেননি। তাঁকে কোন মন্দ বললেও তিনি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন না। প্রতি মুহূর্তে তাঁর খেদমতের জন্যে প্রস্তুত থাকেন।
“আমার পূর্ব পুরুষ বাদশাহ শাহজাহানের আমালে বোখরা থেকে দিল্লী আসেন। তখন থেকে পুরুষানুক্রমে দিল্লীতে বসবাস করার ফলে আমরা শহুরে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। মাওলানা মওদূদী হায়দারাবাদ থেকে দারুল ইসলামে আসার পর আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়।”
“আমাদের পরিবারসহ মাত্র তিনটি পরিবার নিয়ে দারুল ইসলামের বসতি শুরু হয়। সাদাসিধে গ্রাম্য ঘরবাড়ি। না সেখানে বৈদ্যুতিক আলো আছে, না পানির কল এবং না জীবন যাপনের অন্যান্য সহজ উপায়-উপাদান। এটা ছিল আমার জীবনে ধৈর্য্যশীলতার প্রাথমিক স্তর।”
“একবার আমাদের ঘরে জ্বালানী কাঠ ছিল না। মাওলানা সকালে নাশতা করে অফিসে চলে যান। তখন আমি বসে বসে ভাবতে লাগলাম কি করি। এমন সময়ে মাওলানা অন্দরে এসে বললেন, ‘ব্যাপার কি, এমন চুপচাপ বসে রয়েছ যে?”
বললাম, ‘জ্বালানী কাঠ নেই, পাচিকা বসে আছে।’ তিনি বললেন, ব্যাস এতটুকুতেই অধীর হয়ে পড়েছ? এই বলে একটা কুঠার হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরের বাইরে কতকগুলি কাষ্ঠখণ্ড পড়েছিল। তা নিজ হাতেই ফাড়তে শুরু করলেন। কুঠারের দু’এক ঘা মারতেই চারদিক থেকে লোকজন ছুটে এলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যে জ্বালানি কাঠের স্তূপ হয়ে গেল।”
“এমনি একদিন কি কারণে ভিস্তিওয়ালা পানি দেয়নি। সেদিন ছিল আবার ভয়ানক গরম। আমি তো মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলাম। মাওলানা জানতে পেরে দু’টি বালতি হাতে কূপে চলে গেলেন এবং নিজ হাতেই পানি তুলে বালতি ভরতে লাগলেন। লোকজন তা দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে বাড়ি ঘর ভরে দিল।” [বেগম মওদূদী মাহমুদা খাতুন ২০০৩ সালের ৪ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।]

মাহিরুল কাদিরী
পাক-ভারতের বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক এবং মাসিক পত্রিকা ‘ফারান’র সম্পাদক জনাব মাহিরুল কাদিনী বলেনঃ
“আমি মাওলানার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করি। আমার বিশ্বাস, লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি দ্বীনের যে খেদমত করছেন, বর্তমান যুগে তার তুলনা বিরল। এমন কি আরব দেশগুলিতেও তার তুলনা নেই।”
মাওলানা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেনঃ
“তিনি ইসলামী জগতের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তিনি মুসলমানদের মধ্যে সত্যিকার ইসলামী গবেষণার সূত্রপাত করেছেন এবং মানুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনয়ন করেছেন- যিনি কোরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যকার, সত্যের সহায়ক, সত্যবাদিতার মূর্ত প্রতীক- ইসলামী ঐতিহ্যের অস্পষ্ট চিত্রাবলীর রূপদানকারী, আল্লাহর দ্বীনের একনিষ্ঠ সেবক, যাঁর কথা ও কাজে পূর্ণ বিশ্বাস করা যায়, যাঁর সমগ্র যৌবনকাল দ্বীনের কাজে উৎসর্গীকৃত এবং তাঁরই চিন্তা গবেষণায়, শ্রম ও সাধনায় যিনি অকালবৃদ্ধ-যাঁর কথা ও লেখা শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশ কাল যাবত সত্যের আহ্বান জানিয়ে আসছে, এত বড় বিজ্ঞ আলিম-যিনি একই সময়ে কোরআন-হাদীস, ফিকাহ, ইলমে কালাম, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, শাসনতন্ত্র, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণামূলক আলোচনা করতে পারেন- যিনি যুক্তির সম্রাট এবং জ্ঞানের সাগর, শুধু প্রাচ্যেরই নন পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার সাথেও যিনি শুধু পরিচিতই নন বরং তাকে পরীক্ষা ও যাচাই করে দেখেছেন, যিনি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং রাসূল (সাঃ)-এর আনুগত্য পালনের আহ্বায়ক মুলতান জেলের প্রাচীর চতুষ্টয় ও লাহোর দুর্গের অন্ধকার ফাঁসিকক্ষ যাঁর আন্দোলন স্তব্ধ করতে পারেনি, কুফরের ফতোয়াবাজি যাঁর কণ্ঠরোধ করতে পারেনি, যিনি কোরআন ও সুন্নাহর কষ্টিপাথরে প্রত্যেক কথা ও কাজকে যাচাই-পর্যালোচনাকারী এবং কষ্টিপাথরে যা কিছুই ধরা পড়ুক তা যত বড় বিদ্বান পণ্ডিতের বেলায় হোক না কেন, নির্ভয়ে প্রকাশকারী, দ্বীনের প্রতিষ্ঠা যাঁর ব্রত, সত্যের আহ্বান যাঁর কর্মসূচী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি যাঁর লক্ষ্য-সত্য প্রচারের জন্যের যিনি সমগ্র জগতের রোষানলে ভীত শঙ্কিত নন এবং স্বীয় সুনাম নষ্টের ভয়ও যার নেই অজ্ঞ-অর্বাচীনরা তাঁর প্রতি নানা প্রকারের অপবাদ করলেও যিনি সবকিছুই ধৈর্য সহকারে উপেক্ষা করেছেন, যাঁর লেখনী উর্দু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও পবিত্র করেছে এবং উর্দু ভাষার অমূল্য অবদান হয়ে রয়েছে- বক্তৃতায় এক অভিনব প্রকাশ ভঙ্গিমার যিনি উদ্ভাবক এবং বক্তৃতাকালে মনে হয় যেন থমথমে আকাশ থেকে ঝটিকাপ্রবাহ ও বিদ্যুতমালার স্ফূরণ -যাঁর নামে ‘কাদিয়ানীবাদ’ প্রকম্পিত ও হাদীস অবিশ্বাসকারীদের শ্বাসরোধ শুরু হয়, যিনি সুন্নাতের পরিপোষক ও শির্কবিদয়াতের মূলোৎপাটক, যিনি জ্ঞান গরিমা ও অসাধারণ খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও সাধারণ লোকের সঙ্গে বিনা-লৌকিকতায়, সরলতা ও মিষ্ট মধুর ভাষায় এমনভাবে মিশতে পারেন যেন অপরের সঙ্গে তাঁর কোন পার্থক্যই থাকে না, যিনি শুধু একজন আলিম, চিন্তাবিদ, বাগ্মী এবং গ্রন্থকারই নন, বরং এমন এক মর্দে মুজাহিদ মৃত্যুদণ্ডাদেশ শ্রবণেও তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় না-যিনি ইতিহাস-সৃষ্ট নন, বরং ইতিহাস-স্রষ্টা।”
বশীরুল ইবরাহিমী
আলজিরিয়ার জননেতা এবং তথাকার জমিয়তে উলামায়ে মুসলিমীনের সভাপতি আল্লামা মুহাম্মদ আল-বশীরুল ইবরাহিমী বলেন-
“তাঁর মত (সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী) মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। বিশেষ করে তাঁর মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও গুণসম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি আলেম সমাজে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন- আমি অতি অল্পই দেখেছি। তাঁর গুণপনার মধ্যে বিশেষ গুণ এই যে, তিনি সত্যের উপর অচল-অটল, সত্যপথে ধৈর্যশীল এবং শাসকশ্রেণীর তোষামোদ করা তো দূরের কথা, তাঁদের সাহায্য লাভেরও বিরোধী।
“পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান আমি যাঁদেরকে দেখেছি এবং যাঁদের সম্পর্কে জানতে পেরেছি, ইসলামী শরীয়ত ও ইসলামী ইতিহাসের তথ্যাদি সম্পর্কে তিনি সকলের চেয়ে অধিক জ্ঞান লাখেন। তাঁর অধ্যয়ন অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। তিনি সূক্ষ্ম বোধশক্তি, উচ্চতম মস্তিষ্ক, স্বচ্ছ চিন্তাশক্তি ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী।
“আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা সম্পর্কে মাওলানা মাওদূদী যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছে। সকলকে তিনি ন্যায়ের কষ্টিপাথরে যাচাই করেন।”
“বিগত মাসে পাকিস্তানে বিশেষ উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং কিছু খুন খারাবীও হয়। আরব দেশের সংবাদপত্রগুলো এ সম্পর্কে কোন বিস্তারিত সংবাদ পরিবেশন করেনি বলে আমি এর কারণ ও গুঢ় রহস্য বুঝতে পারিনি। তবে আমার সুস্পষ্ট ধারণা এই যে, ইসলামী শাসনতন্ত্রের দাবিই এ সবের মূলীভূত কারণ। সম্ভবত গভর্ণমেন্ট দেশের মধ্যে মাওলানা মওদূদী এবং তাঁর সহকর্মীগণের ক্রমবর্ধমান প্রভাব লক্ষ্য করে অধিকাংশ সহকর্মীকে কারারুদ্ধ করেছেন। অতঃপর লাহোরে সামরিক আইন জারি করে সামরিক বাহিনীর উপরই সকল ভার ন্যস্ত করা হয়। সামরিক আদালত মাওলানাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। পরে জানতে পালাম মৃত্যুদণ্ড রহিত করে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। পাকিস্তানের মুসলমানগণ এই জুলুমশাহীর সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শোভাযাত্রার তুমুল ঝড় উত্থিত হয়। দেশময় বিক্ষোভের ফলেই যে মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
ওদিকে মিসর, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত প্রভৃতি স্থানের সুসংগঠিত ইসলামী প্রতিষ্ঠান ও আনজুমানগুলোর পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ উত্থিত হয় এবং পাকিস্তান সরকারের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। আমি যখন কুয়েতে ছিলাম, তখনই এসব সংবাদের সত্যতা জানতে পারি। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে এবং জমিয়তে উলামা ও এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধের ভিত্তিতে আমিও বিক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়ে পড়েছি। কারণ মাওলানা মওদূদীর ব্যক্তিত্ব কোন এক বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব মুসলিম জাহানের অনুসরণযোগ্য। আমাদের প্রতি তাঁর যে হক আছে, তার মধ্যে একটি এই যে, গভর্ণমেন্ট যখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন, তখন তাঁর মুক্তির জন্যে আন্দোলন করা আমাদের কর্তব্য।…”
“মাওলানা মওদূদী আল্লাহর পথে যে জিহাদের অভিযান শুরু করেছেন, তার জন্যে এ জগতে এতটুকু প্রতিদানই যথেষ্ট যে, দুনিয়ার মুসলমান তাঁর সাহায্যর-সহযোগিতার জন্যে একতাবদ্ধ হয়েছেন। এর চেয়ে বিরাট ও চিরস্থায়ী প্রতিদান তাঁর জন্যে আল্লাহর নিকট গচ্ছিত আছে।”

ডাঃ মুহম্মদ আতাউর রহমান নদভী
‌’এতো ইবনে তাইমিয়ারই রং।’
আজ থেকে পনেরো বছর আগে একখানি পবিত্র মুখ থেকে আমি উক্ত কয়েকটি কথা শুনতে পেয়েছিলাম। যে মর্মস্পর্শী ভঙ্গিমায় কথাগুলো শুনেছিলাম, সে দৃশ্য অবিকল সুরক্ষিত অবস্থায় আমার চোখের সামনে ভাসমান রয়েছে। মনে হয় যেন এখনও সেই মুখমণ্ডল আমি দেখতে পাচ্ছি এবং সেই মর্মস্পর্শী কথাগুলো আজো আমার কর্ণকুহরে ঝংকৃত হচ্ছে।
সব কথা খুলে বলাই শ্রেয় মনে করি।
আমি ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় পাঠ্যভ্যাস করছিলাম। ১৯৩৫ সালে দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় (লাখনো) ভর্তি হই। এ সময়ে ‘তর্জুমানুল কোরআন দেখার আমার সুযোগ হয়েছিল। আমার মনের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তর্জুমানুল যে, তর্জুমানুল কোরআন’ পাঠ করা আমার এক স্বাভাবিক চাহিদা হয়ে পড়েছিল।
গ্রীষ্মের বন্ধে যখন আমি বাড়ি যাই (মৌজা-পাহাড়পুর বাজার, পোঃ বড় হরিয়া, সারন) তখন তর্জুমানুল কোরআন সঙ্গে করে নিয়ে যাই। অতঃপর অতি আগ্রহে আমি আমার মুহতারাম পিতার নিকটে উক্ত পত্রিকার বিষয় উত্থাপন করি। তিনি তা দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আমার পিতা জনাব মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ জামিল আনসারী (রহঃ) একজন সত্যনিষ্ঠ দ্বীনের আলেম ছিলেন। তিনি সমগ্র জীবন অধ্যাপনায় কাটিয়ে দেন। তিনি শুধু অধ্যাপকই ছিলেন না বরং একজন মুফতীও ছিলেন। তিনি ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক এবং এর দারুল ইফতার মুফতী ছিলেন।
“তর্জুমানুল কোরআনের” যতগুলি সংখ্যা আমার কাছে ছিল, তার সবই পিতার খেদমতে হাযির করলাম। এসব দেখে তিনি সর্বপ্রথম যে মন্তব্য করেন তা হচ্ছে এই-মিঞা, এসবই কোরআন এবং সুন্নায় আছে। এখন শুধু তার আমলের প্রয়োজন। সাধারণ ইংরেজী শিক্ষিত লোকে এসব বিষয়ে তাঁদের পত্র-পত্রিকায় লিখে থাকেন, কিন্তু নিজেরা তা মেনে চলেন না।”
‘উনিশ শ’ ছত্রিশ সালের ছুটিতে যখন বাড়ি আসি, তখন ‘তর্জুমানুল কোরআনের’ সদ্য প্রকাশিত সংখ্যা এনে পিতাকে দিলাম। তিনি তা বেশ মনোযোগ সহকারে পাঠ করে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আমার বিরাট ভুল ধারণা ছিল। এ ব্যক্তি (মওদূদী) শুধু ইংরেজী শিক্ষিতই নন, বরং আরবী ভাষায়ও মহাপণ্ডিত। আচ্ছা, তাঁর বয়স কত?’
আমি বললাম, ‘খুব সম্ভব ত্রিশ-বত্রিশ হবে।’
তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘এত অল্প বয়সে এতখানি পাণ্ডিত্য ও যোগ্যতা? তাঁর পত্রিকা পাঠ কররে অবাক হতে হয়।’
“আমি মাওলানা মওদূদী সাহেবকে সবকিছু জানিয়ে দিলাম। তিনি তখন পাঠানকোটে এসে পড়েছিলাম। মাওলানা প্রভ্যুত্তরের সঙ্গে ‘সিয়াসী কাশ্‌মকাশ্‌, ‘ দীনিমাত’ প্রভৃতি গ্রন্থাবলী পাঠিয়ে দিলেন। আমার বুযুর্গ পিতা মরহুম এসব গ্রন্থ বারবার পাঠ করেন এবং বলেন, ‘এ ব্যক্তি সম্পর্কে আমার ভ্রান্ত ধারণা ছিল। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। এত অবিকল আল্লামা ইবনে তাইমিয়ারই রঙ। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এমন এক কালে যখন প্রকৃত প্রতিভাবান ব্যক্তি বিরল এবং বিশেষ করে এই হিন্দুস্তানে, এই ব্যক্তির কেমন করে আবির্ভাব হলো? ইনি যখন এর আদর্শ কার্যকর করতে থাকবেন, তখন তার সাথে চরম বিরোধিতা শুরু হবে। কারণ পৃথিবীতে সত্যনিষ্ঠ ও সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তির সাথে এরূপ ব্যবহারই হয়ে থাকে। এমনও হতে পারে যে, তাঁকে শহীদ করা হবে।’
এ সময় হতে ‘তর্জুমানুল কোরআন’ পাহাড়পুর বাজার, আনসারী কুতুবখানার ঠিকানায় নিয়মিত আসতে লাগলো। পিতা ছুটিতে কলকাতা থেকে বাড়ি এলে তা অবসর সময় মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। অবশেষেএকটি আদর্শবাদী দল গঠনের আবশ্যকতা সম্পর্কে যখন ‘তর্জুমানুল কোরআনের’ সম্পাদকীয় প্রবন্ধে মাওলানা মওদূদী ইঙ্গিত করতে আরম্ভ করেন, তখন আমার বযুর্গ পিতা বলেন-
‘যদি এ দল গঠিত হয়, তাহলে এর প্রথম সদস্য আমি হবো।’
কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, উক্ত দল (জামায়াতে ইসলামী) কায়েম হবার মাত্র দশ দিন পূর্বে (১৬ই আগস্ট, ১৯৪১ সাল) আমার পিতা জান্নাতবাসী হন। আল্লাহ তাঁকে রহম করুন।
এ সময়ে আল্লামা সাইয়েদ সোলায়মান নদভী (রহঃ) এক বিরাট জনসভায় মাওলানা মওদূদীর বিরাট ব্যক্তিত্বের কথা ঘোষণা করেন।
উনিশ শ’ চল্লিশ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে দারুল উলুমের প্রাক্ত ছাত্রদের “নদভী সম্মেলন” হয়। আমি ১৯৩৯ সালে নদওয়ার দারুল উলুম থেকে সনদপ্রাপ্ত হয়েছিলাম। অতএব “নদভী সম্মেলন” যোগদান করার জন্যে আমিও লাখনো গিয়েছিলাম। এ সম্মেলনে যোগদানের ব্যাপারে যা আমাকে বিশেষ অনুপ্রেরণা দিয়েছিল তা এই যে, ঠিক ঐ সময়ে মাওলানা মওদূদীরও লাখনো আসার কথা ছিল। আমার মত নদওয়ার অন্যান্য প্রাক্তন ছাত্রদেরও মাওলানার সাথে আলাপ করার বিশেষ আগ্রহ ছিল। সম্মেলন শেষে মাওলানা মওদূদী নদওয়ার মেহমানখানায় তাশরীফ আনেন। সকল শিক্ষক এবং প্রাক্তন ছাত্র তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। নদওয়ার কর্তৃপক্ষ সুধীবৃন্দ এবং ছাত্রদের সম্মুখে বক্তৃতা করার জন্যে মাওলানা মওদূদীকে অনুরোধ করেন। লাখনোর আঞ্জুমানটি ছিল লাখনো বিশ্ববিদ্যালয় এবং নদওয়ার ছাত্র প্রতিষ্ঠানগুলির দ্বারা গঠিত। মাওলানা মওদূদী ‌’নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা’ সম্পর্কে তাঁর বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় বক্তৃতা করেন। মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী সভাপতিত্ব করেন এবং আল্লামা সাইয়িদ সোলায়মান নদভী মাওলানার পরিচয় করিয়ে দেন। যে কথাও যে ভাষায় জনাব সাইয়েদ সাহেব মাওলানার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তা আজো আমার কর্ণকুহরে ঝংকৃত হয়। তিনি বলেছিলেন–
আমি আপনাদের সামনে একটি যুবক অথচ এক জ্ঞান সমুদ্রের পরিচয় করিয়ে দিতে দাঁড়িয়েছি। আজ সমগ্র শিক্ষিক জগত মাওলানা মওদূদীর পরিচয় লাভ করেছে। তিনি বর্তমান যুগে ইসলামের একজন মুখপাত্র এবং দীনের একজন বিরাট আলেম। ইউরোপ থেকে ধর্মদ্রোহিতা এবং নাস্তিক্যবাদের যে প্রবল বন্যা ভারত পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবার দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা এই পবিত্র হস্তেই ন্যস্ত করেছেন। তিনি ইউরোপের প্রাচীন ও আধুনিক চিন্তাধারা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান লাভ করেছেন। শুধু তাই নয়, কোরআন এবং সুন্নাহ সম্পর্কেও তিনি এমন গভীর জ্ঞানের অধিকারী যে, তারই পরিপেক্ষিতে বর্তমান যুগের সকল সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান তিনি পেশ করতে পারেন। এ জন্যেই বড় বড় নাস্তিক ও খোদাদ্রোহী তাঁর অকাট্য যুক্তি তর্কের সম্মুখে নতি স্বীকার করেছে। একথা দ্বিধাহীন চিত্তে স্পষ্ট ভাষায় বলা যেতে পারে যে, ভারত এবং ইসলামী জগতের সুমলমানগণ দ্বীনের ব্যাপারে মাওলানা মওদূদীর কাছে বিরাট কিছু আশা করতে পারে।

আগা সুরেশ কাশ্মীরী
মাওলানা মওদূদীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পাকিস্তানের মানসিক প্রতিভাকে জ্ঞানের রাজপথ প্রদর্শন করেছেন।
যে সময়ে আমাদের ইসলামী ভাবধারা দু’শত বছরের পরাধীনতার নাগপাশে পরিত্যক্ত হয়েছিল, সে সময়ে তিনিই ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন হিসাবে পেশ করেছেন।
তাঁর আন্দোলন এমন একটি শক্তি, যা আধুনিক ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
তাঁর চিন্তাধারার মধ্যে ইসলামের এতখানি প্রাণশক্তি বিদ্যমান যে, বর্তমান যুগের নব্য যুবকদল তা মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে উদ্যোগী হতে পারে।
দেশের নিত্য পরিবর্তনশীল শাসনতন্ত্র আইনের বলে দেশের স্থূল দেহিক বিপ্লব কিছুকালের জন্যে দমন করতে পারে। কিন্তু মানসিক বিপ্লব দমন করার কোন শক্তি অথবা অস্ত্রশস্ত্রাদি তার নেই। আমাদের সমাজ জ্ঞাতসারে অজ্ঞাতসারে অথবা কতিপয় বিশেষ কারণে ইসলামের বিপক্ষে এক মানসিক বিপ্লব গড়ে তুলেছে। এর গতিরোধ করার যদি কারো সাধ্য থাকে, তা একমাত্র মাওলানা মওদূদী এবং তাঁর আদর্শভিত্তিক দলেরই আছে।

মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী
পাঠকদের কাছে তর্জুমানুল কোরআন সম্পাদকের পরিচয় দান নিষ্প্রয়োজন। তাঁর প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিরাট দ্বীনী খেদমতের কথা তর্জুমানুল কোরআনের পৃষ্ঠায় বারবার আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান যুগের অশান্তি-অনাসৃষ্টি প্রতিরোধের জন্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বক্ষকে বিশেষভাবে প্রশস্ত ও উন্মক্ত করে দিয়েছেন্ তাঁর লেখা প্রতিটি ছত্র আধুনিক শিক্ষিতদের জন্যে অমৃতস্বরূপ। এ ব্যাপারে উলামা সমাজে মাওলানার স্থান অতি উচ্চে। তিনি প্রকৃতপক্ষে মিল্লাতের চিন্তাশীল পুরুষ।

মাওলানা মানাযের আহসান গিলানী
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সাহেবের সুস্থ প্রকৃতি, সুষ্ঠু চিন্তাশাক্তি এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রতি আমার চিরদিনই আস্থা রয়েছে। তাঁর আচার-আচরণ খোদা প্রদত্ত। সমস্যাবলীর প্রতি তাঁর দৃষ্টি সূক্ষ্ম, গভীর ও সর্বন্যাপী। তাঁর সমালোচনা এত পুঙ্কানুপুঙ্খ যে, কোন বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। তাঁর কার্যপদ্ধতি মনোমুগ্ধকর, ব্যাখ্য-বিশ্লেষণ হৃদয়গ্রাহী। এতদসহ তাঁর মহৎ প্রকৃতির সাক্ষ্য ত আমি বারংবার দিয়েছি। স্বয়ং এ অধম মাওলানা আবদুল বারীর সাহচর্যে উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কার্য গ্রহণের জন্য মাওলানাকে অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা অতীব শোচনীয় থাকা সত্ত্বেও তিনি সন্তুষ্টচিত্তে আমাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাঁর আত্মা এত বিরাট ও ঐশ্বর্যশালী, মননশীল ও চিন্তাশীল, প্রবন্ধকার হিসাবে যিনি খোদাপ্রদত্ত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাঁকে বেশী কিছু বলার ধৃষ্টতা ত ছিল না। কিন্তু এতটুকু বলতে চাই যে, আল্লাহ তায়ালা মাওলানা মওদূদীর উপরে অসাধারণ কৃষা বর্ষণ করেছেন। ঈমানের জ্যোতিতে তাঁর অন্তর উদ্ভাসিত দেখতে পাই। নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সাঃ)-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও আস্থা দিয়ে তাঁর অন্তর সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এতদসহ নানাবিধ যোগ্যতায় তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে। এ সমুদয় সাহিত্য, মন ও ঈমানের শক্তি দিয়ে আল্লাহর পথে আহ্বানকে জীবনের লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করে যদি তিনি দণ্ডায়মান হন এবং উর্দু, ইংরেজী, হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় যদি কিছুদিন এ কাজ করা যায়, তা হলে হয়ত হতে পারে যে, লোকে সহসা তা গ্রহণ করবে না, কিন্তু ইসলাম যে সব স্বাভাবিক জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়, অন্তত মনের মধ্যে যে সব জিজ্ঞাসার স্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠবে।

মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী
তাঁর লেখার পদ্ধতি, অকাট্য যুক্তি, মৌলিক ও বুনিয়াদি আলোচনা পদ্ধতি এবং সর্বোপরি তাঁর সুষ্ঠু চিন্তাধারা ছিল আমাদের প্রকৃত ও মানসিকতার অত্যন্ত উপযোগী। এমন মনে হচ্ছিল যে, তাঁর খোদাপ্রদত্ত লেখনীশক্তি আমাদের মূক প্রতিভা ও রুচিরই মুখপাত্র। যেদিন নদওয়ার দারুল ইলুমের মসজিদ সংলগ্ন মেহমানখানায় বসে আমরা কয়েক বন্ধুতে হিজরী ১৩৫৬ সালের মহররম মাসের তর্জুমানুল কোরআনের সম্পাদকীয় প্রবন্ধ পড়ছিলাম, যাতে একটি প্রলয়ের ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছিল-তা কখনো ভুলবার নয়। এ মাওলানার এমন এক উদ্দীপনাপূর্ণ প্রবন্ধ ছিল যার প্রতিধ্বনি শুনা যেতো বহুদিন ধরে। আমরা সকলে মাওলানার বিচক্ষণতা, অন্তর্দৃষ্টি, সংকটের প্রতি অংগুলি নির্দেশ এবং তাঁর অসাধারণ লেখনীশক্তির অন্তর দিয়ে প্রশংসা করেছি। এরপর মাওলানার যেসব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, তা আমরা আনন্দের সাথে পড়তাম।

মাওলানা মুহাম্মদ মনযুর নো‘মানী
মাওলানা মওদূদী এবং জামায়াতে ইসলামীর কাজের মধ্যে যা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, হাজার হাজার তরুণ যুবক যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও শিক্ষায়তনের নাস্তিকতাপূর্ণ পরিবেশের প্রভাবে ইসলামের প্রতি সন্দিহান হয়ে তা একেবারে পরিত্যাগ করেছিল অথবা করার উপক্রম করেছিল, মাওলানা মওদূদীর প্রবন্ধাদি এবং জামায়াতে ইসলামীর কর্মতৎপরতা তাদেরকে শুধু যে ইসলামের দিকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছে তা নয়, বরং তাদের ব্যবহারিক জীবনে এমন এক ইসলামী বিপ্লব সাধিত হয়েছে যে, অনেক বংশানুক্রমিক দ্বীনদারদের জন্যে তা ছিল এক শিক্ষণীয় ব্যাপার।

অধ্যাপক আলফ্রেড স্মিথ
মাওলানা মওদূদী বর্তমান যুগের ইসলামী চিন্তাধারার উপরে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং তাঁর দল পাকিস্তানের প্রতীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে একটি। এই আন্দোলন যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছে তা অতি বিরাট ও ব্যাপক। এই সাহিত্য বেশীর ভাগ উর্দু ভাষায়। তথাপি এর আরবী ও ইংরেজী অনুবাদ দিন দিন বেড়ে চলেছে। মওদূদী সাহেবের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি আপন ভাবধারা ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত ধারাবাহিকতার সাথে একটি সঠিক এবং আকর্ষণীয় জীবন ব্যবস্থা হিসাবে পেশ করেছেন। মওদূদী সাহেবকে আধুনিক যুগে ইসলাম সম্পর্কে সংগঠিত ও আদর্শভিত্তিক পদ্ধতিতে একজন চিন্তাশীল পুরুষ বলে মনে হয়। তিনি ইসলামকে একটা শাসন-শৃঙ্খলার ছাঁচে ঢালবার আধুনিক ঝোঁক-প্রবণতাকে সুষমামণ্ডিত করে তুলেছন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলামী আইন কানুনকে আধুনিক যুগের একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকরী ব্যবস্থা হিসাবে পেশ করেছেন। তিনি ইসলামকে এমন এক জীবন ব্যবস্থা হিসাবে পেশ করেছেন যা বহু শতাব্দী পূর্বেই ভবিষ্যতের সকল যুগের সকল মানবিক সমস্যার সমাধান সংগৃহীত রেখেছে। তাঁর কাছে ইসলাম এমন কোন ধর্ম নয়, যে প্রতিদিন প্রত্যুষে মানুষকে তার সমস্যার সমাধানকল্পে নতুন খোদায়ী জ্ঞান দান করার এক নতুন ঝঞ্ছাট সৃষ্টি করবে। যে চিন্তা ব্যবস্থাকে তিনি ক্রমশ মজবুত করে তুলেছেন তার উৎস ইসলামের প্রাথমিক যুগ, যেখান থেকে এই ব্যবস্থা-প্রাসাদের মৌলিক ভিত্তি সংগৃহীত হয়। এতদসহ তিনি যথেষ্ট পরিমাণ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারারও সুযোগ গ্রহণ করেছেন।
সত্য কথা এই যে, পাকিস্তানের মানসিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সময়ে তিনি বুদ্ধিজীবীদের এবং জনসাধারণেও একটা বিরাট অংশকে প্রভাবিত করেছেন। নৈতিক অধঃপতনের প্রবল ঝঞ্ছায় তিনি আপন সংকল্পিত লক্ষ্যের জন্যে অনুপম ঐকান্তিকতা ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন।
মাওলানা মওদূদী সাহেবকে একজন বিরাট এবং মহান ব্যক্তি মনে করি। এমন লোক অল্পই জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু আজ তিনি এত বড় হয়েছেন যে, এমন বড় তাঁকে আগে মনে করিনি। আমি ভাবতেই পারিনি যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্যে এমন এক সৌভাগ্য সৃষ্টি করে রেখেছেন যে, তিনি দ্বীনের পথে একদিন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আল্লাহ তাঁকে হাজারের মধ্যে বেছে নিয়ে এমেন উচ্চস্থান দান করেছেন।’

রাজা জগনফর আলী খান
ঊনিশ শ’ উনচল্লিশ থেকে নিয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত আমি লাহোর ইসলামিয়া কলেজে পড়াশুনা করতাম। এ সময় মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী হাবিবিয়া হলে ইসলামিয়াতের উপর লেকচার দেয়ার জন্যে প্রতি রোববারে আসতেন। শুক্রবার ছিল কলেজের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কিন্তু রোববার দিনে খেলাধুলা ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদি হতো। মাওলানার লেকচারও ঐদিন হতো। কলেজের সকলেই তাঁর লেকচার ক্লাসে যোগদান করত।
এ এমন এক সমায়ের কথা যখন মাওলানার দুধ-আলতা রঙের মুখমণ্ডলের উপরে দাড়ি ছিল কালো বর্ণের। মাথায় কালো টুপি, পরণে ডার্ক-ব্রাউন শিরওয়ানী এবং সাদা পায়জামা, চোখে নীল চশমা। মাওলানার যৌবনকাল তখন। কিন্তু কখনো তাঁর স্বভাবের মধ্যে রুক্ষতা অথবা ভাবাবেগ দেখিনি। কথা বলার ধরন বড়ই শালীনতাপূর্ণ এবং যা বলতেন তা খুবই যুক্তিসঙ্গত।
তাঁর ক্লাসে যোগদানকারী ছেলেরা কাগজ-পেনসিল সাথে করে আনত। লেকচার শেষ হলে কাগজের টুকরোয় প্রশ্ন করা হতো। মাওলানা তার সুন্দর করে জওয়াব দিতেন।
এ সময়ে খাকসার আন্দোলনের দ্বারা ছাত্ররা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিল। চল্লিশের আগ পর্যন্ত আমি খাকসার আন্দোলনের বলতে গেলে একজন কর্মীই ছিলাম। এ আন্দোলন এবং তার নেতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মাওলানা যে জওয়াব দিতেন, তা আমার মনঃপূত হতো না বলে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারিনি। তাঁর সাহিত্যও পড়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। সে সময়ে খাকসার আন্দোলন এবং তার মুখপত্র ‘আল-ইসলাহ’ সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ আন্দোলন আমাদের মন-মস্তিষ্ক প্রভাবিত করে রেখেছিল।
চল্লিশের ২৩ শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ অধিবেশনে কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মরহুমের ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হই। তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা, চরিত্রের দৃঢ়তা, তাঁর সততা এবং কার্যকলাপে পরিপূর্ণ নিষ্ঠা আমাকে খাকসার আন্দোলন থেকে মুসলিম লীগের মধ্যে টেনে আনে।
আমার জীবনের তৃতীয় পর্যায়ে আমি ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ি। এ সময়ে মার্কস, লেনিন ও স্টালিনের বই পত্র পড়াশুনা করি। তারপর এ মতবাদের লোকদের প্রতি আকৃষ্ট হই। এতদসত্ত্বেও একটি ধর্মীয় পরিবারের সাথেই আমার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সামাজিক পরিবেশ আমাকে কমিউনিজমের দিকে টেনে নিয়ে যায়। বাড়িতে আব্বা মরহুমের সাথে আমার প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হতো। এমন এক জাহিলিয়াতের বেড়াজালে আটকে পড়েছিলাম যে, আল্লাহ মাফ করুন, আব্বা মরহুম আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেন।
পাকিস্তান হতে তখনও বাকী। এদিন আব্বা মরহুম আমাকে মাওলানা মওদূদীর ইংরেজী বই Towards Understanding Islam পড়তে দেন। বইখানা পড়লাম। তারপর আবার পড়লাম। আমার উপর বইখানির প্রভাব এই হলো যে, আমার মন-মস্তিষ্কের উপরে জমে ওঠা গোমরাহীর অন্ধকার দূর হয়ে গেল। মাওলানার অকাট্য যুক্তি ও বর্ণনাভঙ্গি ছিল বড়ই হৃদয়গ্রাহী, যার ফলে তাঁর অন্যান্য সাহিত্যও পড়াশুনা শুরু করলাম।
পাকিস্তান হওয়ার পর মাওলানা তাঁর ইছরার বাড়ির সামনে সবুজ-শ্যামল ঘাসে-ভরা ছোট্ট বাগানটিতে বিকেলবেলা বৈঠক করতেন। আমি যেখানে গিয়ে বসতাম। তখন অতটা ভিড় জমতো না। আমি মাওলানাকে অনেক আজেবাজে এবং অসঙ্গত প্রশ্ন করে বসতাম। মাওলানা তাতে কিছুই মনে করতেন না। প্রত্যেকটি কথার জওয়াব ধীর স্থির ও মিষ্টি ভাষায় দিতেন। বেখাপ্পা প্রশ্নেও কখনো তাঁর চেহারার উপরে বিরক্ত বা রাগের চিহ্ন দেখা যেত না। ‘তুলুয়ে ইসলাম’ পড়ে যেসব প্রশ্ন মনে জাগত, তা অকাতরে মাওলানাকে বলে ফেলতাম। মাওলানা যুক্তির শানিত অস্ত্র দিয়ে ভ্রান্ত প্রশ্নের খণ্ডন করতেন। তাঁর জওয়াবের ধরণটাই এমন ছিল যে, প্রশ্নকারী প্রভাবিত না হয়ে পারত না।
যদি আমার মত লোক শুধু যুক্তির ভিত্তিতে কমিউনিজম পরিত্যাগ করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে, তাহলে এরূপ আরো অনেকেই নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে, যারা নিশ্চিতরূপে মাওলানার সাহিত্যের প্রভাবে সৎ পথ গ্রহণ করেছে অথবা নিদেনপক্ষে জন্মগত মতবাদ থেকে সরে পড়েনি। মাওলানার এ এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে অগাধ জ্ঞানের দিক দিয়ে মাওলানার মত আর কাউকে দেখিনি। এ জন্যে আমি তাঁকে আলবৎ এ যুগের মুজাদ্দিদই বলব।
আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, তোমার কাছে বিখ্যাত ব্যক্তি কে. তাহলে বলব, মাত্র তিনজন- আল্লামা ইকবাল, কায়েদে আযম, মাওলানা মওদূদী।

এ কে ব্রোহী
মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার চরিত্র ও ভূমিকা। যদি কোন মানুষের চরিত্র ও ভূমিকাকে পালটে দেয়া এবং তার মধ্যে কোন প্রকার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে যিনি এ কাজটি করেন তিনিই সে মানুষটির জীবনের স্থপিত বা নির্মাতা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমার মতে বর্তমানে পাকিস্তানে সবচেয়ে বিরাট ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন মাওলানা মওদূদী।
আমি এ কথার সত্যতা স্বীকার করছি যে, যদি এ প্রশ্ন করা হয়, সে ব্যক্তি কে যিনি পাকিস্তানবাসীর চরিত্র ও ভূমিকাকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করেছেন, তাহলে আমার উত্তর হবে মাওলানা মওদূদী। আমার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে যে, আজ আমি যে কথা বলছি আগামীকালও তাই বলব। আর যদি আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করতে চান, তাহলে সেদিনও এই সাক্ষ্যই দিব যা আজ দিচ্ছি।

শরীফুদ্দীন পীরযাদা
পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা যাঁরা ছিলেন মাওলানা মওদূদী ছিলেন তাঁদের প্রথম সারির লোক। তিনি এবং অন্যান্যগণ এ বিষয়ে যেসব পরিকল্পনা এবং প্রস্তাব পেশ করেন, পাকিস্তান সংগ্রামে তা দিগদর্শনের কাজ করেছে। মাওলানা মওদুদী একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্যে যে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেন, তা ১৯৩৮ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরের তর্জুমানুল কোরআনে প্রকাশিত হয়। আমার ভালোভাবে মনে আছে, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ পাকিস্তান আন্দোলন পরিচালনার সময় অন্যান্য সাহিত্যের সাথে তর্জুমানুল কোরআনের সংখ্যাগুলো নিয়মিতভাবে সঙ্গে রাখতেন এবং একজাতীয়তার ধ্বজাধারীদের যুক্তি খণ্ডনের জন্যে তর্জুমানুল কোরআনের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়ে শুনাতেন।

মাওলানা আমের উসমানী, দেওবন্দ
মাওলানা মওদূদীই একমাত্র ব্যক্তি-যাঁর খোদা প্রদত্ত প্রদত্ত প্রতিভা, লেখনীশক্তি, দ্বীনের সুস্পষ্ট ধারণা, অতুলনীয় নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা শুধু পাকিস্তানেই নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এমন বিরাট সাহিত্য-ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে যে, তার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলতে হয়, এ সাহিত্য-ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছে যে, তার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলতে হয়, এ সাহিত্য-ভাণ্ডারের তুলনায় সপ্তরাজ্য তুচ্ছ। আমার মনে হয়, তাঁর প্রণীত সাহিত্যের এক একটি পৃষ্ঠা এক একটি রত্নের সমতুল্য।

মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বিহারী
আমি আমার মুসলমান ভাইগণ, আলেম, সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও জাতির সুধীবৃন্দের নিকটে খোদা ও রাসূলের নামে আবেদন জানাচ্ছি যে, এমন অতুলনীয় ইসলামী চিন্তাশীল, অদ্বিতীয় সাহিত্যিক এবং জাতীয় সম্পদকে বাঁচানোর জন্যে যেন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করেন এবং অবিলম্বে যথাসম্ভব নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগ্রাম অক্ষুণ্ন রাখেন।

মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বিহারীর সাক্ষ্য
সংবাদপত্রের মাধ্যমে বারবার এ অভিযোগ করা হচ্ছে যে, আল্লামা মওদূদী এবং জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। আমি বেশ কিছুদিন যাবত অসুস্থ। তাছাড়া আমার উপায়-উপাদানও সীমিত। তথাপি আশা করেছিলাম যে, হকপন্থী আলেমগণ জনগণের কাছে সত্যকে তুলে ধরবেন। কিন্তু দেখছি যে কোন কারণে সত্যের আওয়াজও বন্ধ হয়ে আছে। এ জন্যে এ দায়িত্ব পালন করছি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাক্তন মুসলিম লীগপন্থী হিসাবে আমি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও প্রত্যেক মুসলিম লীগপন্থীর অপরিহার্য দায়িত্ব মনে করছি এ বিষয়ে কথা বলার। এমন কি নিজেকে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্যে খোদা ও রাসূল (সাঃ)-এর সামনে জওয়াবদিহির জন্যে দায়ী মনে করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছি যে, আল্লামা মওদূদী কখনোই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেননি। বরং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যখন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী মরহুম এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসকে সমর্থন করতে গিয়ে ঘোষণা করেন যে, জন্মভূমির ভিত্তিতে জাতি গঠিত হয়, তখন আল্লামা মওদূদী বলেন, জাভি ধর্মের ভিত্তিতে হয়, দেশ বা জন্মভূমির ভিত্তিতে নয়। তিনি ইসলামী জাতীয়তা প্রমাণ করে শক্তিশালী সাহিত্য রচনা করেন। হযরত আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী কংগ্রেসী জমিয়তের জওয়াবে এবং তার মুকাবেলা করার জন্যে কোলকাতায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম কায়েম করেন। আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসলামী আল্লামা মওদূদীকে ইসলামের তরবারি বলে অভিহিত করেন এবং তাঁর প্রথম গ্রেফতারের তীব্র প্রতিবাদ জানান। বস্তুত আল্লামা শাব্বীর আহমদ উসমানী এবং জামায়াতে ইসলামী রেফারেন্ডামের সপক্ষে জনমত গঠন করেন, যার ফলে সীমান্ত প্রদেশ এবং সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। উল্লেখ্য যে, আল্লামা মওদূদী পাকিস্তান ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা কখনোই করেননি। তবে ভুল ধারণার সৃষ্টি এর থেকে হয়েছে যে, হযরত আল্লামা মওদূদী কতিপয় মুসলিম লীগ নেতার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, তারা ইসলামী আইন বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করবেন। তার প্রমাণ এখনও পাওয়া যাচ্ছে যে, বিগত পঁচিত বছরেও ইসলামী আইন জারি হতে পারল না। নেতৃবৃন্দের প্রতি সন্দেহ পোষণের জন্যে এ অভিযোগ করা যেতে পারে না যে, তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছেন। তারপর রইল কায়েদে আযমের বিরোধিতার অভিযোগ। আল্লামা মওদূদী তা কোনদিনই করেননি। অবশ্য তিনি বারবার ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তিনি ইসলামের উপরে অমূর‌্য সাহিত্য ও বহু সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেছেন। জাতি তার জন্যে কৃতজ্ঞ।

মাওলানা যাফর আহমদ আনসারী
অবিভক্ত ভারতের অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের জায়েন্ট সেক্রেটারী মাওলানা যাফর আহমদ আনসারী বলেন-
মাওলানা মওদূদীর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় এলাহাবাদে ১৯৩৮ সালে। তখন জামায়াতে ইসলামী হয়নি। মাওলানা উঠেছিলেন ডাঃ নাযীর আলী যায়দীর বাড়িতে। এলাহাবাদ এলে তিনি এখানেই উঠতেন। দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয় ১৯৪১ সালে সেও এলাহাবাদে হারদারায় হাকীম খালিদ সাহেবের বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে। এখানে তিনি ইসলামিয়া কলেজে বক্তৃতাও করেন। মাওলানার গভীর পাণ্ডিত্যের প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম।
কিছুকাল পর আমাকে দিল্লী চলে যেতে হয়। মাওলানা দিল্লী এলে অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হতো। তিনি উঠতেন শ্বশুর বাড়িতে। একবার তিনি চৌধুরী মুহাম্মদ আলীর বাসায়ও উঠেছিলেন। তিনি আমার বাসায়ও আসতেন এবং ঘণ্টারপর ঘণ্টা ধরে আলাপ-আলোচনা হতো। পাকিস্তান হওয়ার আগেই তর্জুমানুল কোরআনের খণ্ডগুলো কায়েদে আযমের লাইব্রেরীর শোভাবর্ধন করছিলো।
পাকিস্তান হওয়ার পর মাওলানা আমার বাসায় কয়েকবার এসেছেন। মাওলানা অন্য কারো প্রস্তাব বা পরামর্শ মানতেন না এ কথা ঠিক নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে নীতিগত কথা তিনি স্বীকার করে নিতেন। আমার একটা বদনাম আছে যে, আমার সাথে মাওলানার সাক্ষাতের পর তিনি কখনো কখনো জামায়াতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেন। মাওলানা প্রত্যেকটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। একটা যুক্ত পেশ করলে তা তাৎক্ষণাৎ মেনে নিতেন।
মাওলানার ব্যক্তিত্ব ছিল অতি বিরাট। অসীম ধৈর্যসহ এবং হাসিমুখে সমালোচনার সম্মুখীন হওয়া তার অন্যতম বিশিষ্ট গুণ ছিল। এ কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, ইসলামের প্রসার ও সমুন্নতির জন্যে যে পথ তিনি সঠিক মনে করতেন তার প্রতি তিনি অটল ও অবিচল থাকতেন।

ডঃ ইবরাহীম আগাহ
তুরস্কের আংকারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ইবরাহীম বলেন-
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী বিরাট পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। এতো বড় স্কলার যে, সারা দুনিয়ায় তাঁর কথা হৃদয়ঙ্গম করা হয় এবং তাঁরঅভিমত মেনে নেয়া হয়। তুরস্কেও মাওলানা মওদূদী সর্বজন স্বীকৃত গ্রন্থকারগণের অন্যতম। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ তুর্কী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।
মাওলানা মওদূদীর সাথে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি। তবে তাঁর গ্রন্থের মধ্যেই তাঁর সাক্ষাৎ পাই। তিনি তাঁর গতিশীল ব্যক্তিত্বের দ্বারা যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন, তা বর্তমান যুগের উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করছে এবং ভবিষ্যতে অধিকতর প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে।

ইয়াসিন উমর
সুদান জাতীয় পরিষদ সদস্য ইয়াসিন উমর বলেন-
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ইসলামী পুনর্জাগরণের আন্দোলন শুরু করেন। আধুনিক যুগে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি পাশ্চাত্য মতবাদ ও চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি যুক্তির কষ্টিপাথরে সুস্পষ্ট করে দেন যে, পাশ্চাত্য মতবাদ ও চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি যুক্তির কষ্টিপাথরে সুস্পষ্ট করে দেন যে, পাশ্চাত্য চিন্তাধারা মানবতার জন্যে ক্ষতিকর। তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার মুকাবেলা করেছেন এবং অন্যকেও মুকাবেলার ক্ষেত্রে নিয়োজিত করেছেন। এ বিরাট কাজের সূচনা তিনি চিন্তার ক্ষেত্র থেকে করেন। তিনি এক নতুন বর্ণনাভঙ্গিতে ইসলামী মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির এমন এক চিত্র পরিস্ফুট করেন যে, যে সব মুসলমান পাশ্চাত্য চিন্তাধারার মুকাবেলা করতে না পারার কারণে ইসলাম থেকে সরে পড়েছিলো, তাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন হয় এবং যারা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলো তারাও ইসলামের দিকে ফিরে আসে। মাওলানা মওদূদীর সাহিত্য তাদের মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করেছে এবং মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের জন্যে এক বজ্র-কঠিন সংকল্প সৃষ্টি করে দিয়েছে। ….. সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী শুধু পাকিস্তান ও এশিয়ায় নন বরং আফ্রিকা এবং সারা বিশ্বে মুসলমান যুব সমাজকে তাদের সঠিক পরিচয় সম্পর্কে অবহিত করেন। বিশ্ব যুব মুসলিমকে তিনি ইসলামকে কেন্দ্র করে একত্র করেছেন, ইসলামকে তাদের জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে দিয়েছেন।
ইতিহাসে সাইয়েদ মওদূদীর স্থান যে কত উচ্চে তা বলার আগে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই যে, তাঁর সাহিত্য অধ্যয়ন করার আগে আমি কমিউনিজমের প্রবক্তা ছিলাম। নিজেকে একজন কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট বলে পরিচয় দিতে আনন্দ পেতাম। একমাত্র সাইয়েদ মওদূদীর সাহিত্য আমাকে কমিউনিজমের অনুসারী হওয়া থেকে ইসলামের আলোকে টেনে এনেছে।
সাইয়েদ মওদূদীকে আমি বলব একজন মহান ব্যক্তি। কিন্তু আমি অনুভব করছি যে, এ শব্দটি তাঁর মহত্ত্ব বর্ণনা করতে অপারগ। সাইয়ে মওদূদী এমন এক ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছেন, তিনি আজ একজন ইতিহাস-স্রষ্টা। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী পাশ্চাত্য সভ্যতা, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতিকে পরাভূত করেছে। বস্তুত আজ এমন এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে যে, মুসলিম যুব সমাজ নিজেদেরকে ‌’প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’ বলার পরিবর্তে ‘ইসলামী’ বলার আওয়াজ তুলেছে। এ এক বিরাট পরিবর্তন বলতে হবে এবং কালের গতির সাথে সাথে এর প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।

ডঃ সিরাজুল হক (বাংলাদেশ)
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের স্থান বহু উচ্চে। এত উচ্চে যে, শুধু এ কথা বললেই তার সঠিক অনুমান করা যাবে না। তিনি যে জ্ঞান-গবেষণার কাজ করেছেন, তার প্রভাব কয়েক বংশধর পর্যন্ত এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বলবৎ থাকবে। …. মাওলানা মওদূদীই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কোন বিষয়বস্তুর উপরে কলম ধরলে তারপর আর বলার কিছুই থাকে না। তিনি ঢাকায় গেলে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হতো এবং আমি এখানে এলেও সাক্ষাৎ হয়। এই শহর রাওয়ালপিণ্ডিতে একবার এমন পরিবেশে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিলো যে, তা কোনদিন ভুলতে পারব না। পিণ্ডিস্থ I DO NOT AGREE CLUB-এ একবার তিনি আমন্ত্রিত হন। আমাকেও আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো। মাওলানা তাঁর ভাষণের মাধ্যমে সবাইকেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করে ফেলেন। তাঁর যুক্তিপূর্ণ আলোচনায় এমন কিছু নতুন আলোকের সন্ধান ছিলো যে, তার সামনে আর কারো টিকে থাকা সম্ভব ছিলো না।
সাইয়েদ মওদূদী তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর যুগের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছেন। আগামীতে যা কিছু ঘটবে তার উপরেও তাঁর প্রভাব বিদ্যমান থাকবে। বরং কালের গতির সাথে সাথে তাঁর প্রভাব তীব্রতর হতে থাকবে। তারপরে তাঁর পদাংক অনুসরণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং তিনি অধিকতর শ্রদ্ধার পাত্র হিসাবে পরিগণিত হবেন। তিনি সকলের ‘প্রিয়জন’ এবং ‘প্রিয়জন’ হতেই থাকবেন। [I DO NOT AGREE CLUB জাঁদরেল সিএসপি এবং উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মচারীদের একটি বিশেষ ক্লাব। – গ্রন্থকার।