Thursday, October 22, 2015

(পর্ব-১) দাঁড়ি সম্পর্কে মাওলানা মওদূদীর অভিমত ও বিশ্লেষণ

প্রথমেই বলে রাখি শুধুমাত্র তর্ক করা বা ভুল ধরার উদ্দেশ্য যদি পোস্টটী পড়েন তাহলে ভুল করবেন। 
এখানে শুধুমাত্র গঠনমূলক সমালোচনা করা যেতে পারে। তাছাড়া অনুরোধ থাকবে সম্পূর্ন পোস্ট পড়ার পরই মন্তব্য করবেন। 

আমরা ধাপে ধাপে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। 
১. দাঁড়ির ব্যপারে রাসুল (সা) ও সাহাবাদের আমল, নির্দেশনা।
২. তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে দাঁড়ির পটভূমি।
৩. দাড়ির ব্যাপারে মাওলানা মওদুদীর অভিমত।
৫. মাওলানার (মওদূদী) অভিমতের বিশ্লেষণ।
৪. তৎকালীন সময়ে মাওলানার অভিমতের ভিত্তিতে আলেমদের প্রতিক্রিয়া
৬. পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত

১. দাঁড়ির ব্যপারে রাসুল (সা) ও সাহাবাদের আমল, নির্দেশনা।
(কওমী ফতোয়া) 
عن ابن عمر  : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( خالفوا المشركين وفروا اللحى وأحفوا الشوارب  . وكان ابن عمر إذا حج أو اعتمر قبض على لحيته فما فضل أخذه
হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা কর। দাড়ি লম্বা কর। আর গোঁফকে খাট কর।
আর ইবনে ওমর রাঃ যখন হজ্ব বা ওমরা করতেন, তখন তিনি তার দাড়িকে মুঠ করে ধরতেন, তারপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩}
দাড়ি লম্বা রাখার ব্যাপারে হাদীসে বিভিন্ন শব্দ এসেছে। যেমন-
১-إعفاء اللحى [ইফা] সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৪৭৫
২- وأعفوا اللحى [উফু] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৪
৩-وَأَرْخُوا اللِّحَى [আরখু] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৬২৬
৪-وَأَوْفُوا اللِّحَى [আওফু] সহীহ মুসলিম হাদীস নং-৬২৫
৫- وَفِّرُوا اللِّحَى [ওয়াফফিরু] সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩
দাড়ি কেটে ফেলার নির্দেশ কোন হাদীসে নেই।
হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা কর। দাড়ি লম্বা কর। আর গোঁফকে খাট কর।
আর ইবনে ওমর রাঃ যখন হজ্ব বা ওমরা করতেন, তখন তিনি তার দাড়িকে মুঠ করে ধরতেন, তারপর অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৫৫৩}
এখানে যদিও হজ্ব ও উমরার সময়ের কথা বলা হয়েছে ,কিন্তু মুহাদ্দিসীনরা বলেন তিনি তা সব সময়ই করতেন । এ ছাড়াও আবু দাউদ ও নাসাঈর বর্ণনায় ইবনে উমরের (রাঃ) হজ্ব ও উমরা ছাড়া অন্য সময়েও দাড়ি এক মুঠের বেশীটুকু কেটে ফেলার কথা রয়েছে।
(ফাতহুল বারীঃ খন্ড-১০ পৃঃ ৩৬২)
কোন হাদীসেই সরাসরি দাড়ি এক মুষ্ঠি পরিমাণ রাখার কথা উল্লেখ নেই , শুধুমাত্র লম্বা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সাহাবায়ে কেরাম থেকে এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ি রাখা প্রামাণিত আছে । দাড়ি সম্পর্কিত হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী আবু হুরাইরা ইবনে উমর (রাঃ) প্রমুখ গণ দাড়ি এক মুষ্ঠি পরিমাণ রাখতেন । তাই এ ব্যাপারে তাঁদের আমল আমাদের জন্য দলীল । 

হযরত উমর (রাঃ) তো নিজেই এক ব্যক্তির দাড়ি ধরে এক মুঠের অতিরিক্ত অংশটুকু নিজেই কেটে দিয়েছিলেন । (ফাতহুল বারীঃ খন্ড-১০ পৃঃ ৩৬২)
উপরোক্ত দু’জন মহান সাহাবী ব্যতীত আবু হুরাইরা ,জাবির (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে ও দাড়ির এক মুঠের অতিরিক্ত অংশটুকু কেটে ফেলার কথা পাওয়া যায় । 

২. তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে দাঁড়ির পটভূমি। 
দাঁড়ির ব্যপারে লিখিত কোন দলীল না থাকলেও এ ব্যপারে সবাই একমত যে, মুসলিম পুরুষগন (বলা যায় আগের জমানায় যে কোন পুরুষগনই) দাঁড়ি রাখাকে পৌরষোত্বের প্রতিক মনে করতেন। সুতরাং কেউ যে দাঁড়ী কাটতে পারে তা কল্পনাই করতনা। 
ইংরেজরা উপমহাদেশে আসার পরই একদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন শুরু হয়। শিক্ষিত মুসলমানরা ইংরেজীয় পোশাক তথা "শার্ট প্যান্ট" পড়াও শূরু হয় অথচ তৎকালীন সময়ে এই পোশাকও হারাম বলেই ফতোয়া দিতেন আলেমরা। ছবি তোলাকেতো রীতিমত আতংক মনে করতেন তারা। আর ইংরেজী শিক্ষা করাও সর্বোসম্মতভাবেই নাজায়েজ ছিল। তাহলে চিন্তা করুন দাঁড়ি কাটাকে কি পরিমান ঘৃণা করতেন আলেমরা !!! 
অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষা যে অল্পকয়েক মুসলিমরা গ্রহণ করেছিল তারা সবাই দাড়ি না রাখাই স্মার্টনেস মনে করে শেভ করা শুরু করল। 

৩. দাড়ির ব্যাপারে মাওলানা মওদুদীর অভিমত। 
তার অভিমত পরে বিশ্লেষণ করা হবে। তার আগে রাসায়েল মাসায়েল থেকে নেয়া দাড়ি বিষয়ে প্রশ্নত্তোর দেখে নেয়া যাক। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষনীয় যে প্রশ্নগুলা ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে করা হয়েছিল। 





৫. মাওলানার (মওদূদী) অভিমতের বিশ্লেষণ। 
* দাড়ি রাখার পরিমানের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদিসও নেই। 
* সাহাবারাও এ ব্যপারে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা দেননি। ৩-৪ জন সাহাবা ছাড়া জানাও যায়না সাহাবারা কতটুকু দাড়ি রেখেছেন।  
১. মাওলানা দাড়ি বিষয়টাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাননি বা তর্কে জড়াতে চাননি। 
২. যে যেমন ইচ্ছা দাড়ি রাখতে পারবে বলেছেন। তবে এক মুষ্টী উত্তম। দাড়ি বড় করা সর্বোত্তম। 
৩. তবে মতামত দিয়েছেন যে চাইলে এক মুষ্ঠী পরিমাণএর চেয়ে কম রাখতে পারবে যদি দাড়ি দেখে বুঝা যায় যে তিনি সুন্নাতের উদ্দেশ্যেই রেখেছেন। 
৪. অনিয়মিত দাড়ি বা যদি মনেহয় দাড়ি রাখেন না বা অনিয়মিত শেভ করেন, এমন দাড়ি রাখা যাবেনা। 
৫. উনি মাসালাটা দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে যারা দাড়িই রাখতে চান না বা রাখেন না। 
৬. যারা দাড়ি রাখেনই তাদেরকে দাড়ি ছোট করার জন্য বলেননই। 
৭. আর যে কেউই এ ব্যপারে ইখতিলাফ করতে পারবেন। তাছাড়া এ ব্যাপারে তামাম আলেমরাই একমত যে ২ ধরনের ইজতিহাদ হলে ২ টাই সঠিক। যদি ইজতিহাদ কারী ভুল করেন তাহলে পাবেন ১ গুন সওয়াব, আর যদি সঠিক হন তাহলে ২ গুন সওয়াব। 

৬. পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত 
১. সুতরাং দাড়ি ছোট রাখার ব্যপারে বাড়াবাড়ি করা যাবেনা। রাসুল (সা) প্রত্যেকটি বিষয়ে আমল দেখিয়ে ও শিখিয়ে ও বলে দিয়েছেন। অনেক ছোট ছোট বিষয়ো বাদ যায়নি যেমন, কিভাবে খেতে হবে, কথা বলতে হবে, গোসল করতে হবে, এমনকি ইস্তিঞ্জার নিয়মও বিস্তারিত বলে গেছেন। 
তাছাড়া উম্মতদের মাঝে ভবিষ্যতে কি ধরনের ফিতনাহ আসতে পারে তাও সতর্ক করে গেছেন। দাড়ির পরিমান জিনিসটা যদি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হত তাহলে নিশ্চয় এ বিষয়ে একবার হলেও বলে যেতেন যে কতটুকু পরিমানের কম দাড়ি রাখা যাবেনা। বরং দাড়ি রাখাটাই গুরুত্বপূর্ন, তবুও ফরজও না। 
২. দাড়ি রাখা সর্বোসম্মতভাবে ওয়াযিব। 
৩. আরকটি বিশেষ ব্যপার লক্ষনীয় যে, তৎকালীন সময় হিসেবে উনি ফতোয়াটা দিয়েছিলেন যখন বর্তমানের মত দাড়ি বিভিন্ন স্টাইলে রাখাটা ফ্যাশন ছিলনা। সুতরাং সে সময়ে এই বিষয়টা নিয়ে আলেমরাও তেমন বাড়াবাড়ি করেননি এখনকার আলেমরা যতটা বাড়াবাড়ি করছেন। ১৯৪৪-৪৫ সালের দিকে প্রায় সব আলেমের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল মওদুদীর। এমনকি দেওবন্দী অনেক বড় আলেমও তার সাথে দ্বীনের কাজ করে গেছেন। 
৪. সর্বোশেষে এটাই বলা যায়, যেহেতু দাড়ি এখন মুশরিদের একটা ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে; যেহেতু মুশরিকদের বিরোধীতা করাই দাড়ি রাখার মূল উদ্দেশ্য; সুতরাং এক মুষ্টী পরিমাণ রাখাই উত্তম; অথবা এমন ভাবে রাখতে হবে যাতে সুন্নাহের উদ্দেশ্য বুঝা যায়;  স্টাইল করে দাড়ি রাখা সুন্নাতের বরখেলাফই না বেয়াদবীও বটে। 
আমার মনেহয় মাওলানা মওদুদী (রহ) আজ বেচে থাকলে, এরকম ফিৎনা করার চেয়ে নিজের মতামতই উঠিয়ে নিতেন। 

আল্লাহ সব জানেন। আমাদের ভুল ত্রুটী ক্ষমা করুন। আমীন। 







3 comments:

  1. রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দাড়ি লম্বা করার কথাই এসেছে। কোথাও খাট করার কথা আসেনি। খাটো করা নিয়ে সাহাবির কর্ম জানা যায় (এক মুষ্টির অতিরিক্ত)।
    সুতরাং দাড়ি না ছাটাই উত্তম। যদি ছাটতেই হয় তবে এক মুষ্টির কম যেন না হয়।

    https://islamqa.info/en/6657

    ReplyDelete
  2. আলহামদুলিল্লাহ অনেক উপকৃত হলাম।

    ReplyDelete
  3. ধন্যবাদ।।আমি দাড়ি শেভ করবো কিনা চিন্তা করছিলাম যেহেতু অনেক আলেমি বলতে চাচ্ছে শেভ করাও হারাম আর এক মুষ্ঠির কম রাখাও হারাম।।।তাহলে আর এক মুষ্ঠির কম রেখে লাভ কি?!রাখলে এক মুষ্ঠি রাখবো নাহয় শেভ করবো।।।

    তবে এই আলোচনা থেকে দাড়ি রাখার ব্যাপারে উতসাহিত হলাম।।।

    ReplyDelete