ঊনিশ শ’ আটত্রিশ সনের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী দাক্ষিণাত্যের হায়দারাবাদ থেকে পূর্ব পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার পাঠানকোট নামক স্থানে হিজরত করেন। আল্লামা ইকবাল মরহুমের পরামর্শে পাঠানকোট শহর থেকে প্রায় চার মাইল দূরে ‘দারুল ইসলাম’ নামে একটি ইসলামী গবেষণাগার স্থাপিত হয়। ১৯৩৮ সন থেকে ভারত বিভাগের সময় পর্যন্ত দারুল ইসলাম শুধুমাত্র ইসলামী গবেষণাকেন্দ্রই ছিল না, বরঞ্চ এখান থেকে বেশ কিছু সংখ্যক ইসলামের সাচ্চা সৈনিক ও মর্দে মুজাহিদও তৈরি হয়েছিলেন।
এ কথা উল্লেখযোগ্য যে, পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক ইকবাল মাওলানা মওদূদীর প্রকাশিত তর্জুমানুল কোরআন নিয়মিত পাঠ করতেন। তিনি মাওলানার বিপ্লবী চিন্তাধারা ও প্রবন্ধাবলীর দ্বারা এতখানি প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাকেঁ মাঝে মাঝে এরূপ মন্তব্য করতে শোনা যেতো “একমাত্র এ মওদূদীই বিভ্রান্ত ভারতীয় মুসলমানদেরকে একটা সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে।” কারণ দার্শনিক ইকবাল মাওলানার মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন ভবিষ্যতের এক মহান মানুষের সুস্পষ্ট নিদর্শন। মাওলানার বিভিন্নমুখী প্রতিভা, কর্মদক্ষতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নিষ্কলুষ চরিত্রের পরিচয় পেয়ে কবি ইকবাল তাকেঁ লাহোর ডেকে পাঠান। এটাই ছিল কবি ইকবালের সাথে মাওলানার প্রথম সাক্ষাত পরিচয়। আলাপ-আলোচনার মূল বিষয় এই ছিল যে, পাঞ্জাবকেই মাওলানার কর্মস্থল বানানোর জন্যে বিচক্ষণ কবি অনুরোধ করেন। সাক্ষাতের পর মাওলানা পুনরায় হায়দারাবাদ গমন করেন।
মিল্লাতে ইসলামিয়ার ভবিষ্যত সঠিক কর্মপন্থার জন্যে যাঁরা চিন্তা ও পরিকল্পনা করছিলেন, তাদেঁর মধ্যে চৌধুরী নিয়ায আলী খান সাহেবও একজন ছিলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর চিত্র কবি ইকবালের নিকট পেশ করেন। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে কবি এ বিষয়ে কিছু করতে তাঁর অক্ষমতা জ্ঞাপন করে বলেন, “যেমন করেই হোক মাওলানা মওদূদীকে ‘দারুল ইসলামে’ নিয়ে আসুন।”
এখানে একটি মজার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। একবার পাঞ্জাবের পতোকী শহর ভ্রমণের আমার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলাম জনৈক বুযুর্গ হাকীম নে’মাত আলীর গৃহে। তিনি আমার কাছে যে ঘটনাটি বিবৃত করেন তা এই-
জনৈক খোদাপ্রেমিক চৌধুরী নিয়ায আলী খান তাঁর বিরাট সম্পদ দ্বীনের কোন কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে বন্ধু-বান্ধবের পরামর্শ চান। তাঁর জনৈক বন্ধু এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করার জন্যে তাকে আল্লাম ইকবালের নিকট যেতে বলেন। অতঃপর চৌধুরী নিয়ায আলী খান আল্লামা ইকবালের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর মনের বাসনা তাঁর কাছে ব্যক্ত করেন। আল্লামা ইকবাল তাঁর সকল কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করার পর উঠে বাড়ীর ভেতরে চলে যান। চৌধুরী সাহেব বহুক্ষণ আল্লামার প্রত্যাগমনের অপেক্ষায় বসে থাকার পর নিরাশ হয়ে উঠে আসেন। আল্লামা তাঁকে কোন একটি কথাও না বলায় তিনি অত্যন্ত দুঃখিত হন।
অতঃপর তাঁর বন্ধুটি একথা শুনে বলেন, “আপনি পুনরায় আল্লামার নিকটে যান। তিনি অতি দার্শনিক ও চিন্তাশীল। হয়তো কোন চিন্তার সাগরে ডুবে গিয়ে আপনার কথা ভুলে গেছেন। এবার হয়তো আপনাকে সঠিক পরামর্শই দিবেন।” চোধুরী নিয়ায আলী পুনরায় আল্লাম ইকবালের নিকট তাঁর বাসনা ব্যক্ত করে বিনীত কন্ঠে বলেন-
“হুযুর সেদিন আমাকে কোন কথা না বলেই ভেতরে চলে গেলেন। তাতে করে আমার বিশ্বাস যে, আমার পরিকল্পনাটি আপনার মনঃপূত হয়নি।”
আল্লামা বলেন, “সেকি, কিছু বলিনি? বলেছি, আলবৎ বলেছি। তুমি বুঝতে পারনি।”
অতঃপর তিনি মাওলানা মওদূদী সম্পাদিত ‘তর্জুমানুল কোরআন দেখিয়ে বলেন-
“সেদিন তুমি লক্ষ্য করনি, এ পত্রিকাখানি তোমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভেতরে চলে গেলাম? তার অর্থ হলো এই যে, তোমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজন এ পত্রিকার সম্পাদক আবুল আ’লা মওদূদীর। তাকে আনতে পারলে তোমার সব কাজ হবে।”
চৌধুরী নিয়ায বলেন, “হুযুর, তাঁর সাথে তো আমার পরিচয়ই নেই।”
আল্লামা বলেন, “আচ্ছা, ঠিক আছে। সে অমুক দিন দিল্লী আসছে। আমরা একখানা চিঠি নিয়ে তার সাথে দেখা করো।”
যথা সময়ে চৌধুরী নিয়ায আলী খান দিল্লী গিয়ে আল্রামার পত্র মাওলানা মওদূদীর হাতে দেন।
মাওলানা মওদূদী আল্লামা ইকবালের পত্র পাঠে হতবাক হন। আল্লামা তাকে হায়দারাবাদ পরিত্যাগ করে পাঞ্জাবে চলে আসার আহ্বান জানান। মাওলানা মওদূদী অতঃপর কিছুদিন পরে আল্লামার সাথে সাক্ষাত করেন এবং বিষয়টির উপরে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
অতঃপর মাওলানা হায়দারাবাদ পরিত্যাগ করে ‘দারুল ইসলাম’ এসে পৌঁছেন। কিন্তু কে জানতো যাঁর আহ্বান অনুরোধে মাওলানা তাঁর জন্মভূমি ও আত্মীয়-বন্ধু পরিত্যাগ করে বিদেশের এক পল্লীগ্রামে নিজের আবাস-স্থল বেছে নিলেন, তিনি ডাক দিয়েই পরপারে যাত্রা করবেন? মাওলানা ‘দারুল ইসলাম’ পৌছে তাঁর লট-বহর সাজ-সরঞ্জাম সাজিয়ে-গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত রয়েছেন এমন সময় লাহোর থেকে সাইয়েদ নযীর নিয়াযী সাহেবের একখানা পত্র তাঁর হস্তগত হলো। পত্রের সারমর্ম নিম্নরুপঃ
“ডাক্তার সাহেবের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তিনি আপনাকে একবার দেখার জন্যে খুবই ব্যস্ত। সম্ভব হলে শীঘ্রই চলে আসুন।”
মাওলানা মওদূদী নিজে এ সম্পর্কে বলেন, “আমি পত্র পেয়ে হতবাক হলাম। সবেমাত্র নতুন জায়গায় এসে পড়েছি। মালপত্র স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে আছে। মনে করলাম একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে দু’চারদিন পর যাব। কিন্তু কে জানতো যে, মরণের ফেরেশতা একেবারে ওৎ পেতে বসে রয়েছেন। লাহোরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ আল্লামার ইন্তেকালের সংবাদ এসে পৌঁছালো।”
অজানা-অচেনা বিদেশ বিভূঁয়ে পা দিতে না দিতেই তাঁর হিতাকাঙ্খী ও পৃষ্ঠপোষকের পরলোকগমনে হয়তো মাওলানার জীবনতরী বিরাট ধাক্কা খেলো, ক্ষনিকের জন্যে ঘুপাক খেলো; কিন্তু সুদক্ষ কর্ণধার নীরবে অবিচল চিত্তে সবলে হাল ধরে রইলেন।
আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীর প্রবন্ধাদির দ্বারা অত্যান্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন। লাহোর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ইকদাম’ পত্রিকার সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ শফি সাহেব বলেন যে, আল্লামা ইকবাল ‘তর্জুমানুল কোরআনের’ ঐসব প্রবন্ধ অন্যের সাহায্যে পাঠ করিয়ে শুনতেন। এ সবের দ্বারা তিনি এতটা মুগ্ধ ও প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, মাওলানাকে তিনি দাক্ষিণাত্যের হায়দারাবাদ ত্যাগ করে পাঞ্জাব চলে আসতে অনুরোধ জানান। তাঁর এ আহ্বানেই মাওলানা মওদূদী ১৯৩৮ সালে পাঞ্জাবে চলে আসেন।
মিয়া মুহাম্মদ শফি সাহেব ১৯৬৩ সালের ৯ই জুনে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইকদমে ‘লাহোরের ডাইরী’ শীর্ষক প্রবন্ধে মন্তব্য করেন-
“মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তো প্রকৃতপক্ষে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দুশমন ছিলেন। আমি পূর্ণ দায়িত্বের সাথে একথা বলছি যে, আমি আল্লামা ইকবালকে একথা বলতে শুনতাম, “মওদূদী এসব কংগ্রেসী মুসলমানদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে।” আল্লামা ইকবাল আষাদ (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ) ও মাদানির (মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী) সুস্পষ্ট ভাষায় সমালোচনা করতেন। কিন্তু তিনি মাওলানা মওদূদীর তর্জুমানুল কোরআনের বিশেষ বিশেষ অংশ অন্যের দ্বারা পড়িয়ে শুনতে অভ্যস্ত ছিলেন। তারপর এ ব্যাপারে তো আমি ষোলআনা দায়িত্ব সহকারে বলছি যে, আল্লামা ইকবাল একখানা পত্রের দ্বারা দাক্ষিণাত্যের হায়দারাবাদের পরিবর্তে পাঞ্জাবকে কর্মস্থল বানানোর জন্য মাওলানা মওদূদীকে অনুরোধ জানান এবং এ পত্রখানা তিনি আমারই দ্বারা লিখিয়েছিলেন।”
No comments:
Post a Comment