Thursday, October 22, 2015

হিজরত আন্দোলনও মাওলানা মওদূদী

খেলাফত আন্দোলন ব্রিটিশের অনমনীয় মনোভাব লক্ষ্য করে ভারতের আলেম সমাজ ঘোষণা করেন যে, ভারত ‘দারুল হরব’ এবং এখান থেকে হিজরত করা মুসলমানের দ্বীনী দায়িত্ব। ১৯২০ সালে মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রাঁচী জেল থেকে মুক্তি লাভ করার পর হিজরত আন্দোলন শুরু করেন।
সে সময়ে আফগানিস্তানের বাদশাহ আমীর আমানুল্লাহ খান এক জনসভায় বলেন যে, ভারতীয় মুসলমান হিজরত করে আফগানিস্তান চলে যেতে পারে। মাওলানা আযাদের কথায় মুসলমানগণ চক্ষু বন্ধ করে হিজরতের জন্যে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। হিজরত কমিটি গঠিত হয় এবং দিল্লীতে দস্তুর মতো তার দফতর কায়েম করা হয়। হাজার হাজার ধর্মভীরু মুসলমানপরিবার নামমাত্র মূল্যে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হিজরত কমিটির দফতরে পৌঁছতে থাকেন। শুধু আগস্ট মাসেই আঠারো হাজার লোক হিজরত করে আফগান সীমান্ত অতিক্রম করে। প্রায় পাঁচ লক্ষ মুসলমান হিজরতের নামে তাদের বহু মূল্যবান সম্পদ হাতছাড়া করে।
মওদূদী ভ্রাতৃদ্বয় (আবুল আ’লা মওদূদী ও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আবুল খায়ের মওদূদী) হিজরতের উদ্দেশ্যে দিল্লী হিজরত কমিটির দফতরে হাজির হন। মাওলানার জনৈক পরিচিত বন্ধু মিঃ তোজাম্মেল হোসেন ছিলেন সেক্রেটারী। তার সাথে মাওলানার দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনায় মাওলানা জানতে পারেন যে, হিজরতের পশ্চাতে কোন সুচিন্তিত ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা বা স্কীম নেই। শত সহস্র লোক আফগানিস্তানে চলে যাচ্ছেন, অথচ আফগান সরকারের সাথে এ ব্যাপারে কোনই আলাপ-আলোচনা করা হয়নি। হিজরতের ব্যাপারে মুফতী কেফায়েতুল্লাহ, মাওলানা আহমদ সাঈদ প্রমুখ জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের নেতৃবৃন্দ পরম আগ্রহী ছিলেন। মাওলানা মওদূদী (বালক মওদূদী) তাঁদের সাথে সাক্ষাত করে বলেন যে, কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতিরেকে হিজরত অবাস্তব ও ক্ষতিকর হবে। তাঁরা ত্রুটি স্বীকার করেন এবং বালক মওদুদীকে এ বিষয়ে পরিকল্পনা পেশ করতে অনুরোধ জানান।
মাওলানা মওদূদী প্রস্তাব করেন যে, সর্বপ্রথম আফগান সরকারের সাথে আলোচনা করে এ কথা জেনে নেয়া যাক যে, ভারত থেকে হিজরতকারীগণের পুনর্বাসনের ইচ্ছা তাঁদের আছে কিনা এবং থাকলে তার পদ্ধতি ও কর্মসূচী কি হবে। অতঃপর দিল্লীস্থ আফগান রাষ্ট্রদূতের সাথে সাক্ষাত করে জানা গেল যে, তাঁরা ইতোমধ্যেই এ নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েছেন। যারা ভারত থেকে চলে গেছেন তাঁদেরকে বিদায় করে দিতে সরকার যদিও দ্বিধাবোধ করছেন, কিন্তু তাদের ব্যয়ভার বহন করা সরকারের সাধ্যের অতীত হয়ে পড়েছে। এরপর হিজরত পরিকল্পনার অকাল মৃত্যু ঘটে।
কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতিরেকে শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবপ্রবণতার বশবর্তী হয়ে তদানীন্তন আলেম সমাজ হিজরতের ফতোয়া দিয়ে কয়েক লক্ষ মুসলমানকে নিঃস্ব বাস্তুহারায় পরিণত করেন। মাওলানা মওদূদীর দূরদর্শিতা ও সময়োচিত হস্তক্ষেপের ফলে আরও কয়েক লক্ষ মুসলমান বিপদ থেকে বেঁচে যান।
বালক মওদূদীর এ অসাধারণ প্রতিভা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও জমিয়ত নেতৃবৃন্দকে স্তস্তিত ও আকৃষ্ট করে। যার ফলে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণে বালক মওদূদীকে বারবার অনুরোধ জানান।

No comments:

Post a Comment