যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতাল থকে মৃতদেহ সরানো এবং তা আবার দেশান্তরে নিয়ে যাওয়া এক অতি দুষ্কর ব্যাপার আগে বলেছি। এ সব ব্যবস্থাপনা সুচারুরূপে সমাধা করার ব্যাপারে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহর থেকে আগত মাওলানার ভক্ত অনুরক্তগণ যথেষ্ট সাহায্য করেন। নিউইয়র্কে জানাযার জন্যে সেখান থেকে বারবার টেলিফোনে অনুরোধ আসতে থাকে। ব্যবস্থাপনা কতদূর কি হলো এ সম্পর্কেও বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্বেগের সাথে টেলিফোনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। ডাঃ আহমদের বাড়িতে অবিরাম টেলিফোন ক্রিং ক্রিং করছিল।
ওদিকে মাওলানার মৃত্যু সংবাদ শুনামাত্র আল্লামা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খুমেনী বলেন, “মিল্লাতে ইসলামিয়া একেজন প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ হারাল”। অতঃপর তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বাফেলোতে বেগম মওদূদীকে জানান যে, ইরানের বিমান মাওলানার মাইয়েত বহন করার মত মহান খিদমতের জন্যে প্রস্তুত। মৃত্যু সংবাদে বাদশাহ খালেদ মর্মাহত হয়ে বলেন, আল-উস্তাজ মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর ইন্তেকাল মুসলিম বিশ্বের জন্যে এক মর্মন্তুদ ঘটনা।” তিনিও জানিয়ে দেন যে, সউদী এয়ার লাইন্সের বিমান মাওলানার মাইয়েত বহনের সৌভাগ্য লাভের জন্যে প্রস্তুত। অনুরূপভাবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক মাওলানার মৃত্যু সংবাদে শোকে অধীর হয়ে পড়েন এবং মাওলানার মাইয়েত বহনের জন্যে পিআইএ’র খিদমত পেশ করেন।
বেগম মওদূদী এসব সরকারের প্রতি এবং বিশেষ করে আল্লামা খুমেনী, বাদশাহ খালেদ এবং জেনারেল জিয়াউল হকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “যে ব্যক্তি তাঁর সারা জীবনে কোনদিন একটি বারের জন্যেও কোন বিষয়ে কারও কাছে হাত পাতেননি, তাঁর মৃত্যুর পর এ ধরনের খিদমত গ্রহণে তাঁর প্রতি অশ্রদ্ধাই দেখানো হবে। আমি সকলের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলছি, আমরা আমাদের আপন সাধ্যানুযায়ী এ কাজের আঞ্জাম দেব।”
একটা চার্টার্ড বিমানে বাফেলা থেকে ২৩শে সেপ্টেম্বর বৈকাল চারটায় মাইয়েত নিউইয়র্ক রওয়ানা করার এবং নিউইয়র্ক থেকে পানামের বিমানে রাতের বিমানে লন্ডন পাঠাবার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়।
এক শোকার্ত পরিবেশে অবিরাম অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধেয় মুরশিদে আ’ম-এর মাইয়েতকে শেষ বিদায় দেয়া হলো। তার আগে বেলা আড়াইটায় চতুর্থ বার বাফেলোতে নামাজে জানাযা পড়া হলো। অতঃপর চার্টার্ড বিমানখানি বাফেলোকে অশ্রুসাগরে ভাসিয়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে আকাশে তার পাখা মেলে উড়ে চলল। নিউইয়র্ক থেকে পানাম বিমান মাইয়েতসহ রাতের আঁধার চিরে লন্ডনের উদ্দেশ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের আকাশপথে উড্ডীন হলো।
লন্ডন ও পাকিস্তানে সকলে এ ধারণা পোষণ করতেন যে, আটচল্লিশ ঘণ্টার আগে মাইয়েতের উপস্থিতি আশা করা যায় না। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে নিউইয়র্ক থেকে বিমান রওয়ানা হওয়ার পর এ সংবাদ লন্ডনে পৌঁছানো হয়।
জনৈক চৌধুরী মুহাম্মদ ইয়াসীন মাওলানা ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ট বন্ধু। মাওলানার চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় তিনিও শরীক ছিলেন। তিনি লন্ডনে ব্যবসা করেন। মাওলানাকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর লন্ডন ফিরে আসেন এবং সব সময় ডাঃ আহমদ ফারুকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তিনি বলেন, “হঠাৎ ২৩ তারিখ রাতে আমরা লন্ডনে খবর পেলাম মাওলানার মাইয়েত নিউইয়র্ক থেকে রওয়ানা হয়েছে। তখন কোন পত্রিকায় সংবাদ দেয়ার সময় ছিল না। শুধু টেলিফোনের মাধ্যমে সকল স্থানে খবর পৌঁছানো হলো।”
নিউইয়র্ক থেকে বিমানটি পরদিন অর্থাৎ ২৪শে সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আটটায় লন্ডন বন্দরে অবতরণ করে। ‘আল্লাহু আকবর’ লন্ডন বিমান বন্দরের ইতিহাসে এত বড় গণজমায়েত অতীতে কখনো হয়নি। বিমান পৌঁছুবার পূর্বেই বিমান বন্দর লোকে লোকারণ্য হয়। বিমান বন্দরের দিকে অবিরাম অশ্রুকাতর মানুষের স্রোত দেখা যায়।
বিমান থেকে মাইয়েতের সাথে অবতরণ করেন বেগম মওদূদী, ডাঃ আহমদ ফারুক ও সাইয়েদ মাসউদ। বিমান বন্দরে ক্রন্দনরত হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠ থেকে কালেমায়ে শাহাদাত ও আল্লাহু আপকবর ধ্বনি গুঞ্জরিত হতে থাকে। বিমান থেকে মাইয়েতকে নামিয়ে পি.আই.এ’র শালিমার লাউঞ্জে রাখা হয় এবং ৪৭নং টার্মিনালে নামাযে জানাযার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমবার জনাব খুররম জাহ মুরাদ এবং দ্বিতীয়বার অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ জানাযার নামাযে ইমামতি করেন। তারপর বার্মিংহাম থেকে কয়েকটি বাসভর্তি লোক এসে হাজির হন। এবার নামাযে ইমামতি করেন ইউ.কে ইসলামিক মিশনের সহ-সভাপতি। তারপরও অবিরাম লোক আসতে থাকে। পিআইএ-র বিমান ছাড়তে বেশ বিলম্ব হয়। তার ফলে আরও দু’বার জানাযার নামায আদায় করা হয়। বিমান বন্দরে দেশ-বিদেশের বহু সাংবাদিক উপস্থিত হন। তাঁরা মন্তব্য করেন, শোকে মুহ্যমান এমন জনসমুদ্র তারা কোনদিন দেখেননি এবং কল্পনাও করেননি।
মাওলানার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার জ ন্য বিমান বন্দরে উপস্থিত হন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিশেষ উপদেষ্টা জনাব মুয়াযযম আলী, ইসলামিক কাউন্সিল অব ইউরোপের সেক্রেটারী জেনারেল জনাব সালিম আযম এবং বহু দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিগণ।
সন্ধ্যায় বিলম্বে পিআইএ’র বিমান মাইয়েতসহ রওয়ানা হয় এবং আমস্টার্ডাম, দামেশক ও দুবাই হয়ে পরদিন (৩৫/৯/৭৯) সকাল দশটায় করাচী বিমান বন্দরে অবতরণ করে।
পঁচিশ তারিখে করাচীর ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা।
সকাল ন’টা থেকে করাচী বিমান বন্দরে লোক জমা হতে শুরু হয়েছে। এ দিন ছিল করাচী মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের নির্বাচনের দিন। অধিকাংশ যানবাহন নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত। তথাপি বহু কষ্টে লোক সমান বন্দরের দিকে ছুটছে।
সাড়ে ন’টায় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমীর মিঞা তুফাইল মুহাম্মদ করাচী জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং দশ-বারোজন সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারসহ ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশ করছেন। চেহারা মলিন ও শোকার্ত। পিয়াসীর স্বেচ্ছাসেবকগণ সারিবদ্ধ হয়ে শৃঙ্খলা রক্ষার কাচে দণ্ডায়মান। বাইরে বারান্দায় কয়েকজন বোরকা পরিহিতা মহিলা ক্রন্দনরত। হাজার হাজার লোক বিমানের অপেক্ষায়। ঘোষণা হলো বিমান পৌঁছুতে কিছু বিলম্ব হবে- দশটায় নয়, সাড়ে দশটায়। লাউড স্পীকারে ঘোষণা করা হলো, বিমান পৌঁছুবার পনেরো মিনিট পরে এক মাইল দূরে বিমান বন্দর স্টেডিয়ামে জানাযার নামায হবে। লোক সেদিকেই দৌঁড়াতে থাকে।
মিঞা সায়েব ভিআইপি লাউঞ্জে শোকার্ত জনতার মধ্যে নির্বাক বসে আছেন। খানিক পরে সরদার শেরবাজ মাজারী লাউঞ্জে প্রবেশ করে মিঞা সায়েব, জান মুহাম্মদ আব্বাসী এবং অন্যান্যের সাথে গলা মিলিয়ে শোক প্রকাশ করতে থাকেন।
এমন সময় জনৈক উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী মিঞা সায়েবকে সালাম করে বলেন, “আমি আসছি রাশিয়া থেকে। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করতে গিয়েছিলাম। যখনই সম্মেলনে মাওলানার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছল, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে লোকের হাত উপরে উঠল দোয়ার জন্যে।”
তিনি আরও বলেন, “মাওলানার মৃত্যুতে ক্ষতি শুধু তাঁর পরিবার ও জামায়াতে ইসলামীর নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি হলো।”
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি কথাগুলো বলেন।
ঠিক দশটায় বিমান রানওয়েতে নেমে পড়ে ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে দাঁড়াল। শত শত লোক কান্নায় ভেঙে পড়ল। কয়েকজন শোকে মুহ্যমান হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
বিমান থেকে প্রথমে নামলেন ডাঃ আহমদ ফারুক। অতঃপর বেগম মওদূদী। তাঁর পেছনে অধ্যাপক খুরশীদ, সাইয়েদ মাসউদ এবং ‘ডন ট্রাভেলস লন্ডন’-এর চৌধুরী মুহাম্মদ ইয়াসিন। এ পাঁচজন এলেন মাইয়েতের সাথে।
ভিড়ের মধ্যে বহু কষ্টে মাইয়েতকে ট্রাকে উঠানো হলো। ট্রাকের উপরে মিঞা সায়েব, ডাঃ আহমদ, অধ্যাপক খুরশীদ প্রমুখ নেতাগণ। জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে ট্রাকটি বিমান বন্দর স্টেডিয়ামের দিকে রওয়ানা হলো। এগারোটা পাঁচ মিনিটে জানাযার নামায পড়ালেন মিঞা তুফাইল মুহাম্মদ সায়েব।
নামাযের পর মাইয়েতকে আবার ট্রাকে উঠানো হলো। এবার ট্রাকে অন্যান্যের মধ্যে রয়েছেন সিন্ধুর গভর্ণর জেনারেল আব্বাসী। এতক্ষণ পর্যন্ত লোক অসীম ধৈর্যের সাথে নিজেদেরকে সংযত রেখেছিলেন। কিন্তু এবার তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। অসংখ্য মানুষ সারা শহর থেকে বিমান বন্দরে হাযির হয়েছে। এমন কে আছে যে শেষ বিদায়ের সময় তার প্রিয় নেতার মুখখানা শেষবারের মত দেখে নেবে না? সকলে উন্মাদের মত ট্রাকের পিছনে ছুটছে। সকলেরই বাসনা একবার মাইয়েত স্পর্শ করবে- একবার জ্যোতির্ময় চেহারাখানা প্রাণভরে দেখে দেবে। এ যে শেষ বিদায়ের মুহূর্ত। যিনি তাদের সুপ্ত আত্মাকে জাগিয়ে দিয়েছেন, বিবেকের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, তিনি আজ নিজেই সুপ্ত ও নীরব। তিনি তাঁর কাজ সমাধা করে আপন প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। বারবার ধ্বনিত হতে লাগল- ‘আল্লাহু আকবর’ এবং তার সাথে ’সাইয়েদী-মুরশেদী-বিদায়-বিদায়’।
মাইয়েতকে বিমানে উঠানোর দৃশ্য আরও হৃদয় বিদারক। কতজন একে অপরকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। কতজন সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। বেলা একটায় মাইয়েত বিমানে উঠানোর পর বিমানের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। দেড়টায় বিমান লাহোরের পথে আকাশে তার দু’টি পাখা মেলে উপরে উঠে। বিমানের বিকট শব্দ শোক-সন্তপ্ত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আঘাত করতে থাকে। যদি তাদেরও দু’খানা করে পাখা থাকত, তাহলে পাখির ঝাঁকের মত বিমানের সাথে উড়ে চলত। তাই হাতাশা, দীর্ঘশ্বাস, অশ্রু-এ তিনের সাথে তাদের মুখে ছিল প্রিয় মুরশিদের জন্যে প্রাণভরা দোয়া।
No comments:
Post a Comment