Thursday, October 22, 2015

ভারতে মুসলিম বিরোধী প্রোপাগান্ডা

মাওলানা মওদূদীর ‘আর জিহাদু ফিল ইসলাম’ গ্রন্থ প্রণয়নের কিছু ঐতিহাসিক পটভূমিকা আছে।

ইংরেজী ১৯২৬ সালের শেষ ভাগে শুদ্ধি আন্দোলনের প্রবর্তক ও নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ এক মুসলমান আততায়ীর হাতে নিহত হন। এর ফলে হিন্দু ভারত অতিমাত্রায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক অভিযান শুরু হয় হিন্দুদের পক্ষ থেকে। তারা প্রচার করেন যে, ইসলাম তার অনুগামীদেরকে নরহত্যায় উদ্বুদ্ধ করে। এমন কি মিঃ গান্ধী পর্যন্ত এক বিবৃতির মাধ্যমে মন্তব্য করেন যে, অতীতে তরবারীর সাহায্যেই ইসলাম প্রচারিত হয়েছে এবং বর্তমান কালেও তাই হচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের প্রচারণা ভারতের আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে এবং বিদেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্রপাত হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর এ সমস্ত ভিত্তিহীন এবং উস্কানীমূলক প্রচারণা বন্ধ করতে গিয়ে অতীব দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আহা! আজ যদি ভারতে এমন কোন মর্তে মুজাহিদ আল্লাহর বান্দা থাকতো, যে তাদের এসব হীন প্রচারণার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারতো, তাহলে কতই না ভাল হতো!”

তরুণ মুজাহিদ মাওলানা মওদূদী জামে মসজিদের উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এ সময়ে তিনি ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর মন-মস্তিস্ক এবং শিরায় শিরায় প্রবাহিত হলো জিহাদের অনুপ্রেরণা। তিনি হিন্দুভারত ও অন্যান্য ইসলাম-দুশমনদের জবা দেয়ার জন্য দৃঢ়-সংকল্প হলেন। অতঃপর ১৯২৭ সালের প্রথম থেকেই তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে “আল জিহাদু ফিল ইসলাম” শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তা বিরাট গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। 

ডঃ ইকবাল গ্রন্থখানি সম্পর্কে নিম্নোক্ত মন্তব্য করেন-
“জেহাদ, যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কে ইসলামী আইন-কানুন সম্বলিত এ গ্রন্থখানা অভিনব ও চমৎকার হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানী ও সুধী ব্যক্তিকে গ্রন্থখানি পাঠ করতে অনুরোধ করি।”
মাওলানার নিজ হাতে লেখা গ্রন্থখানি তাঁর আপন চরিত্রের উপরও কম প্রভাব বিস্তার করেনি। তিনি এ বিষয়ে নিম্নরূপ মন্তব্য করেন-
“এ গ্রন্থখানির দ্বারা আমি নিজে সর্বাপেক্ষা বেশী উপকৃত হয়েছি। গ্রন্থখানি রচনা করার সময়ে আমার অন্তরে দ্বীনী মর্যাদাবোধ অপেক্ষা জাতীয় মর্যাদাবোধের আবেগ অনুরাগ প্রবলতর ছিল। কিন্তু গ্রন্থ প্রণয়ন ও তৎসংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধানকালে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার আদেশ নিষেধগুলো সম্পর্কে মনোযোগ সহকারে পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়ন করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তার ফল এই হয়েছিল যে, আমার মনের মধ্যে কেবল মাত্র যে শরীয়তের বিধান সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান এবং তার সত্যতা সম্পর্কেই পূর্ণ প্রত্যয় (Conviction) জন্মেছিল তা নয় বরঞ্চ আল্লাহর শাসন-সংবিধানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে একটা অদম্য প্রেরণার উন্মেষও আমার মনের মধ্যে হয়েছিল। উপরন্তু এ বিষয়ে সংগ্রাম করার কর্মপদ্ধতিও আমি অবগত হয়েছিলাম। এরপর সাংবাদিকতার তদানীন্তন প্রচলিত পন্থা পরিত্যাগ করতে মনস্থ করলাম। এজন্যে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। তখন এরূপ সংকল্প করলাম যে, ভবিষ্যতে যদি কোনদিন সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করি, তবে একমাত্র এই শর্তে করব যে, তাকে ‘দ্বীনে হক’ প্রচারের অস্ত্র স্বরূপই ব্যবহার করব। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর শুধু অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চায় কাটিয়ে দিলাম।”


ঊনিশ শ’ আটাশ সালের পূর্বে মাওলানা মওদূদী জার্মান ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস শিক্ষা করার পর তাঁর শিক্ষক দিল্লী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ায় তাঁরা আশা অপূর্ণ থেকে যায়।


এ সময়ে ‘আল জমিয়ত’ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাথে মাওলানার মৌলিক মতবিরোধ শুরু হয়। জমিয়তে উলামা ভারতীয় কংগ্রেসের অন্ধ সমর্থক হয়ে পড়েছিল। যে সময়ে মাওলানা মুহাম্মদ আলী প্রমুখ দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের একগুঁয়েমি , দ্বিমুখী নীতি ও ইসলাম বিরোধী মনোভাবের জন্য একে পরিত্যাগ করেছিলেন, সে সময়ে সেই কংগ্রেসের তল্পিবাহক হয়ে থাকা জমিয়তে উলামার মর্যাদার পক্ষে অত্যন্ত অশোভনীয় এবং তারই জন্যে ১৯২৮ সালে তিনি উক্ত পত্রিকার সম্পাদনা-ভার চিরদিনের জন্যে পরিত্যাগ করেন।

No comments:

Post a Comment