মাওলানা সারা জীবন যে কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করেন, তার জন্যে তাঁর স্বাস্থ্য অকালেই ভেঙ্গে পড়েছিলো। তিনি দীর্ঘদিন যাবত মূত্রাশয়ের পীড়ায় ভোগেন। তার ফলে হাঁটু ও কোমরের বেদনা বলতে গেলে চিরস্থায়ী হয়ে পড়েছিলো। আটষট্টি সালে লন্ডনে মূত্রাশয় অপারেশন করা হয়। কিন্তু রোগ নিরাময় হয় না। তাই আজীবন তাঁকে রোগ যন্ত্রণায় ভুগতে হয়। এর ভেতরেই তিনি সব কাজ করতে থাকেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দাহর চোখে মুখে কোনদিনই রোগ-যন্ত্রণার কোন বহিঃপ্রকাশ, কোন আলামত দেখা যায়নি।
বাহাত্তুর সালে তাঁর বিপ্লবী তাফসীর ‘তাফহীল কোরআন’ লেখা সমাপ্ত হয়। তার বহু আগে থেকে তিনি বলতেন, “আয়ু ফুরিয়ে এসেছে, দোয়া করুন যেন তাফহীম খতম করে যেতে পারি।”
তাফহীম লেখা খতম হওয়ারপরও আল্লাহ তাঁকে জীবিত রাখলেন। তাঁর জীবনের বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল বিশ্ব নবীর জীবন-চরিত রচনা করার। তিনি কলম ধরলেন। সাত বছরে নবীর মক্কী জীবন লেখা শেষ করলেন। তা দু’খণ্ডে প্রকাশিত হলো। জীবন-চরিতের নাম রাখলেন ‘সীরাতে সারওয়ারে আরম’। মাদানী জীবনের উপরেও প্রয়োজনীয় নোট লেখা শেষ করলেন। কিন্তু তার উপরে কলম ধরার আগেই দীন -দুনিয়ার প্রভুত তাঁকে আপন সন্নিধানে ডেকে নিলেন।
বাইশে সেপ্টেম্বর আমেরিকার বাফেলো শহরের এক হাসপাতালে আধুনিক জগতের শ্রেষ্ঠ মনীষী সাইয়েদ মওদূদী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জানাযা হলো বাফেলোতে, লন্ডনে, করাচীতে, লাহোরে। শরীক হলো মুসলিম বিশ্বের মনীষীগণ, লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ, জনসাধারণ, যুব সমাজ। তাঁর জানাযা অনুষ্ঠানের বর্ণনা নিম্নে সংযোজিত হলো।
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ১৯৭৯ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহরের হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৬শে সেপ্টেম্বর লাহোরে জানাযার পর তাঁর দাফন কার্য সমাপন করা হয়। তাঁর জানাজায় শরীক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। এ সম্পর্কে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু পরিবেশন করতে চাই প্রিয় পাঠক সমাজের কাছে।
২৩শে সেপ্টেম্বর বিকেল বেলা মফস্বল থেকে ঢাকায় ফিরে দুঃসংবাদ পেলাম মাওলানা মওদূদী ইন্তিকাল করেছেন। স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মুখ থেকে ইন্না লিল্লাহ….. বেরিয়ে এলো বটে। কিন্তু মনে হোল মাথায় আকাশ ভেংঙ্গ পড়লো। জানাযার জন্যে আমাকেই যেতে হবে এবং যতো শিগগির পারি। পরদিন ভিসা বিমানের সীট এবং অন্যান্য সব ঝামেলা চুকিয়ে পঁচিশ তারিখে পিআইএ-র বিমানে করাচী পৌঁছলাম। আমার অবস্থাও ছিলো অনুরূপ। ঐদিনই বেলা সাড়ে দশটায় লন্ডন থেকে মাওলানা মরহুমের মাইয়েত (কফিন) করাচী পৌঁছে এবং জানাযার পর লাহোর রওয়ানা হয়ে যায়।
জনৈক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটালাম। রাত সাড়ে ন’টায় মাওলানার জানাযাসহ তাঁর জীবনের উপরে কিছু ফিচার দেখানো হলো পাকিস্তান টেলিভিশনে। প্রবল অশ্রুধারা টিভি দেখতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছিলো। বড় আশা ছিলো মাওলানার শেষ দীদার লাভের। কিন্তু তার অপূর্ণই রয়ে গেল। রাতে লাহোরগামী বিমানের কোন সীট পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে পরদিন সকালের। সকাল সাড়ে দশটায় লাহোরে জানাযা হবে। বিমান লেট হলে জানাযাও ভাগ্যে জুটবে না। এমন এক দুশ্চিন্তায় রাত কাটালাম।
পরদিন সকাল সাতটায় লাহোর রওয়ানা হলাম। হঠাৎ ঢাকা থেকে আমার এক সাথী ছুটে গিয়েছিল। আমি যখন ঢাকা বিমান বন্দরে বিমানে উঠতে যাচ্ছি, তখন পেছন থেকে শ্রান্ত-ক্লান্ত কণ্ঠে আওয়াজ এলো, খান সাব, আল্লাহর শোকরিয়া শেষ পর্যন্ত এসে পড়লাম। পেছন ফিরে দেখি ডাঃ আজিজুল হক চৌধুরী। শুকনো মুখ, উস্কো খুস্কো চেহারা যেন উদ্ভ্রান্ত প্রেমিক। প্রেমিকই বটে। বিমানে উঠার পর একটু জিরিয়ে নেয়ার পর আমার কাছে এসে বললেন, মাওলানাকে তাঁর জীবদ্দশার দেখার সৌভাগ্যে হয়নি। তাই বড় সাধ মরণের পর একবার দীদার লাভের।
বললাম বলুন, আল্লাহ আমাদের আশা পূরণ করুন।
করাচী থেকে লাহোরের পথেও কয়েকজন বন্ধু জুটে গেল। তাদের মধ্যে ছিলেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ইমপ্যাকট’ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আরিফুল হক। নটায় লাহোর বিমান বন্দরে নামলাম। জীবনে বহুবার এ বিমান বন্দরে উঠানামা করেছি। কিন্তু আজ তার এক ভিন্ন রূপ দেখলাম। যেখানে হর হামেশা মানুষ গিজগিজ করে, সে স্থানটি বলতে গেলে একবারে জনমানবহীন। বিমান বন্দরে বাইরে এক শোকাচ্ছন্ন পরিবেশ-একটা মর্মন্তুদ বিচ্ছেদ বেদনার মূর্ত প্রকাশ। নিশ্চিত ছিলাম যে বিমান বন্দরে কেউ আসবে নিয়ে যাবার জন্যে। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখছি না। হয়তো করাচীর বন্ধুরা শোকের আতিশয্যে খবর দিতে ভুলে গেছেন অথবা অন্য কোন কারণ ঘটেছে।
জনাব ফারুকীর বন্ধু গাড়ি নিয়ে এসেছেন তাকে নেয়ার জন্যে। আমাদের সকলের গন্তব্যস্থল একই। তাই তারা আমাদের দু’জনকে তাদের গাড়িতেই উঠালেন। বললাম, তাই সোজা ইছড়া চলুন, যদি আখেরী দীদার হয়ে যায়।
নতুন ফিয়াট গাড়ি শাঁ শাঁ করে ছুটছে, লেজ আকাশে তুলে যেমন ধারা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে একলা মাঠে ফেলে আসা গো-শাবক তার মায়ের কাছে। মিনিট পনেরোর মধ্যে আমরা মুজাং চুঙ্গী হয়ে ফিরোজপুর রোডে এসে পড়েছি। একটু দূরে দক্ষিণে ইছড়া মোড় ঘুরে বামে ঢুকতে হবে যায়লদার পার্ক লেনে। ৫/এ যায়লদার পার্ক মাওলানার বাসভবন। আমাদের গাড়ি ইছড়া মোড়ে পৌঁছতেই জনৈক শোকাকুল পথচারী বলে দিলেন- ঐ দেখুন দক্ষিণ দিকে জানাযার মিছিল চলছে।
সামনে জনসমুদ্র নজরে পড়ল। প্রশস্ত ফিরোজপুর রোডে মানুষ থৈ থৈ করছে। তার মধ্যে প্রাইভেট কার, বাস, পিকআপ, রিজার্ভ করা ট্রাক-অটোরিকশা, স্কুটার, সাইকেল, শোকাকুল গণমিছিল। মুখে উচ্চৈঃস্বরে কালেমায়ে শাহাদাত এবং ‘আল্লাহু আকবার’।
সামনে অর্ধ মাইল দূরে ‘মাইয়েত’ বলে মনে হয়। ভিড়ের মধ্যে গাড়ি চলতে পারে কই? কখনো কখনো এগুচ্ছে ধীরে ধীরে কচ্ছপ গতিতে। অগত্যা খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ফিরোজপুর রোড থেকে বাম দিকে কেটে পড়ে অন্য পথে দ্রুত পৌঁছে গেলাম গাদাফী স্টেডিয়ামে। এখানেই জানাযা হবে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ, দ্বীনের আলেমকুলশিরোমণি, বিশ্বব্যাপী ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের কর্ণধার, বিশ্ববরণ্যে আল-উস্তাজ, আল-মুরশিদুল আম আল্লামা আবুল আ’লা মওদূদীর।
গাদাফী স্টেডিয়াম পাকিস্তানে সর্ববৃহৎ। মাইয়েত পৌঁছুবার আগেই বিরাট বিশাল স্টেডিয়ামের আধখানা ভরে গেছে। স্টেডিয়ামের আটটি ফটক দিয়ে ক্রন্দরত মানুষের প্রবলস্রোত ভেতরে ঢুকছে। সারাদেশ থেকে আগত ইসলামী আন্দোলনের জন্যে উৎসর্গীকৃত প্রাণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার তাগড়া নওজোয়ান শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। শৃঙ্খলার কঠিন বেড়াজাল ডিঙিয়ে সামনে এগুবার উপায় নেই। অসহায়ের মত চারিদিকে তাকাচ্ছি। চোখের পানিতে রুমালখানা ভিজে জবজবা হয়েছে। সাথীরা কোথায় হারিয়ে গেছেন।
সংবাদপত্রের জনৈক ফটোগ্রাফার আমাকে দূর থেকে নিচে ফেলেছেন। চিৎকার করে বললেন, আসুন মাওলানা! আপনাদের মত বিদেশী মেহমানদের জন্যে প্রথম কাতার। এবার স্বেচ্ছাসেবকদের কড়া বেষ্টনী ভেদ করে সামনের কাতারে গিয়ে স্থান নিলাম। ডাঃ চৌধুরীও এসে গেলেন। খানিক পরে ‘মাইয়েত’ মাঠে পৌছে গেল এবং আমাদের সামনে রাখা হলো। সঙ্গে মাওলানা মরহুমের ছেলেরা, মিয়া তুফাইল মুহাম্মদ, অধ্যাপক খুরশীদ, মাওলানা হামিদী, চৌধুরী জিলানী এবং আরও অনেকে। তাঁদের সাথে বুক মেলাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। বহু চেষ্টা করেও নিজেকে সংযত রাখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কলিজাখানা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
সামনের কাতারে আরও অনেকেই ঢুকতে শুরু করলেন এবং কাতার দু’ধারে প্রসারিত হতে লাগল। প্রথম স্থান থেকে ডান দিকে খানিকটা সরে যেতে হলো।
সামনের কাতারে যসব বিদেশী মেহমান ছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সউদী রাষ্ট্রদূত রিয়াদ আল খতীব, জর্দান রাষ্ট্রদূত, আয়াতুল্লাহ খুমেনীর বিশেষ প্রতিনিধি ও ইরান সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব, কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ ইউসুফ আবদুল্লাহ আল-কারযাবী, বিশ্ব মুসলিম যুব সংসদের সহ-সেক্রেটারী জেনারেল ডঃ মুহাম্মদ তুতুঞ্জী, সিরিয়ার প্রখ্যাত পণ্ডিত ও মনীষী শেখ সাঈদ হাওয়া ও শেখ আদনান সাদুদ্দীন, কুয়েত আওকাফ মন্ত্রণালয়ের ইসলাম সম্পর্কিত বিভাগের ডাইরেক্টর শেখ আবদুল্লাহ আল-আকীল, কুয়েতের প্রখ্যাত আইনবিদ এবং বহুল প্রচারিত ‘আল-মুজতামিয়া’ পত্রিকার সম্পাদক শেখ মুবারক আল-মুকাওয়া, মাওলানা মরহুমের বিশিষ্ট বন্ধু শেখ আবদুল আজী আল-আলী আল-মোতাওয়া, মিশরের বিশিষ্ট ইখওয়ান নেতা ডঃ কামাল, হাসানুল বান্না শহীদের পুত্র আইনজীবী শেখ সাইফুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীবৃন্দ। সামনের কাতারে আরো ছিলেন জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমীর মাওলানা ইউসুফ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক, পাঞ্জাবের গভর্ণর লেঃ জেনারেল সরওয়ার খান, দেবল শরীফের পীর সাহেব এবং সামরিক বাহিনীর কতিপয় উচ্চপদস্থ কর্মচারী।
পিপিপি ব্যতীত পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বহু উলামায়ে কেরাম, সুধী ও সরকারী বেসরকারী কর্মচারী স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাযায় শরীক হন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুফতী মাহমুদ, নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, আযাদ কাশ্মীরের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সরদার আবদুল কাইয়ুম খান, সরদার শওকাত হায়াত খান, চৌধুরী জহুর এলাহী, খাজা খায়রুদ্দীন, আল্লামা ইহসান ইলাহী জহীর প্রমুখ। ভারত থেকে আগত প্রায় পৌনে দু’শ আলেম ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মী জানাযায় শরীক হন।
জানাযার ‘কফিন’ জড়ানো রয়েছে কালিমায়ে তাইয়িবাহ সম্বলিত জামায়াতে ইসলামীর পতাকা ও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক সামরিক ইউনিফরমের উপর হাতে কালো ব্যাজ পরেছেন। তিনি নির্দেশ দেন যে, কোন সরকারী কর্মচারী ইচ্ছা করলে মাওলানার জানাযায় শরীক হতে পারে। জানাযার পূর্ব মুহূর্তে স্টেডিয়ামের দৃশ্য হৃদয়বিদারক, বিস্ফোরণোন্মুখ। স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ এবং ভেতরে ঢুকতে না পেরে বাইরে হাজার হাজার মানুষ বুক চাপড়ে মাতম করছে। লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদাত, শোকের মর্সিয়া-ইয়া সাইয়িদী, মুরশিদী, মওদূদী-মওদূদী। লক্ষ লক্ষ কণ্ঠের হাহাকার ও মর্সিয়া স্টেডিয়ামের চারধারে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশ বিদীর্ণ করে ছুটে চলেছে আরশে পাকের দিকে। জনতা মাইয়েতকে এক নজর দেখার জন্যে, মাওলানার জাসাদে খাকীর (মাটির দেহ) শেষ দীদার লাভের জন্যে এবং হাত দিয়ে মাইয়েতের একটু পরশ লাভের জন্যে উন্মত্তের মতো সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। নওজোয়ান স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রাণপণ শৃঙ্খলা রক্ষা করার চেষ্টায় নিয়োজিত।
ইমামে কা’বা শেখ মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন সাবিইয়িল জানাযার ইমামতি করবেন বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু মক্কা মুয়াযযামা থেকে রওয়ানা হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে অনিবার্য কারণে তাঁর সফর বিলম্বিত করতে হয়েছে। অতঃপর ইমামতির ভার দেয়া হলো কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. ইউসুফ আবদুল্লাহ আল-কারযাবীর উপর। তিনি কায়রো জামিয়া আজহার থেকে ইসলামিয়াত ও দীনিয়াতে ডকটরেট লাভ করেছেন। প্রখ্যাত আলেমে দীন এবং মাওলানার প্রতি পরম শ্রদ্ধা পোষণ করেন। তিনি ইমামতির আগে জনতাকে লক্ষ্য করে বলেন, সাইয়েদ মওদূদী তাঁর বিশ্বজনীন দাওয়াত ও চিন্তাধারার জন্যে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি তাঁর শতাধিক অমূল্য সাহিত্য রেখে গেছেন। আর রেখে গেছেন লক্ষকোটি রুহানী আওলাদ। আমি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আসিনি আপনাদেরকে কোন সান্ত্বনার বাণী শুনাতে। বরং এসেছি একথা বলতে যে, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ তাঁর চিন্তাধারায় আকৃষ্ট হয়ে কাজ শুরু করেছে। আমরা মাওলানার আন্দোলনকে নিয়ে জোর কদমে এগিয়ে চলব। পাকিস্তানের জন্যে একমাত্র এটাই মঙ্গলজনক যে, এখানে সত্যিকার ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা হোক। আপনারা যারা মাওলানার প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা পোষণ করেন, তারা এর জন্যে সংগ্রাম অব্যাহত রাখুন।
ডঃ কারযাবীর ভাষণের পর লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে ধ্বনিত হলো- সাইয়েদী মুরশিদী-মওদূদী-মওদূদী। স্টেডিয়ামের বাইরে অপেক্ষমান হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হলো- সাইয়েদী মুরশিদী-মওদূদী-মওদূদী। সে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো আকাশে-বাতাসে, চারধারের বৃক্ষরাজিতে, দালান-কোঠায়, প্রতিটি আনাচে কানাচে।
জানাযার পর জনসমূদ্রের বাধ ভেঙ্গে গেল। সকলের লক্ষ্য মাইয়েত। শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। বহু কষ্টে ভিড়ের চাপ থেকে বাঁচিয়ে মাইয়েত স্টেডিয়ামের বাইরে নিয়ে ট্রাকে উঠানো হলো। চারদিক থেকে মানুষের অসম্ভব চাপের মধ্যে দম বেরিয়ে যাচ্ছিল। ডাঃ চৌধুরী ও আমি একে অপরকে চেপে ধরে বাইরে চলেছি। ডাঃ চৌধুরী তাগড়া পালোয়ানের মত। তাই কতকটা ভরসা ছিল নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারব। বাইরে রাস্তায় নামার পর হঠাৎ আমাদের সামনে দু’ তিনটি যুবক সংজ্ঞাহীন হয়ে ধরাশায়ী হলো। আমার পালোয়ান সাথীটি আর নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে গেলেন। আমিও পড়লাম। শুধু পড়েই গেলাম না। অর্ধ ডজন মানুষ আমার উপরে। কি করে বেঁচে গেলাম জানি না। তবে কালেমা পড়ছিলাম নিশ্চয়ই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দু’ তিন জন আমাকে ধরে তুলে বাইরে বের করে দিলেন। আমার সাথীটি কোথায় হারিয়ে গেলেন। আমার জামাকাপড় ধুলো মলিন। কয়েক স্থানে আঘাতও পেলাম।
তাগড়া যুবকদের সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ার ঘটনা এই একটি নয়-বহু। এমনটি হবেই না বা কেন? মাওলানার জানাযার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর দেশের দূর-দূরান্ত ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে লোক লাহোরের দিকে ছুটেছে উন্মত্তের মত। ট্রেনে, বাসে, বিমানে, স্কুটারে, সাইকেলে- যে যেভাবে পেরেছে এসেছে। কেউ এসেছে পনেরো বিশ মাইল পায়ে হেঁটে। শোক-দুঃখ, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও প্রখর রৌদ্র তাপ উপেক্ষা করে।
সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মাওলানার সাহিত্য, তাঁর বিশ্বজনীন ইসলামী দাওয়াত এবং তাঁর আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব লক্ষ লক্ষ যুবককে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। জাহিলিয়াতের ঘন অন্ধকার থেকে তাদেরকে তাওহীদের উজ্জ্বল আলোকের দিকে টেনে এনেছে। তাদের চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, মন-মানসিকতার এনে দিয়েছে এক বিরাট বিপ্লব। মাওলানার প্রতি তাদের বিরাট আকর্ষণ, শ্রদ্ধা ও প্রগাঢ় ভালবাসার এই একটি মাত্র কারণ। মাওলানার মৃত্যু তাদেরকে পাগল ও দিশেহারা করেছে। এতোবড় এবং এ দরনের শোক তাদের জীবনে এই প্রথম। তারা সব মাওলানার রুহানী আওলাদ। তাই যুবকবৃন্দ নির্বিশেষে অনেকেই এ শোকের আঘাতে মুষড়ে পড়েছেন এবং সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছেন।
যাহোক, আধ মাইল দূরে রাখা হাশের ফারুকীর গাড়িখানা বহু কষ্টে খুঁজে বের করলাম। গাড়িতে কেউ নেই। শরীর কাঁপছে। দুটি চোখ দিয়ে পাহাড়ি ঝরণা ছুটছে। মিনিট দশেক পর ডাঃ চৌধুরী এলেন। কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন সর্বনাশ হয়েছে।
বললাম, বেঁচে তো আছেন। এরপর সর্বনাশটা কিসের শুনি?
বললেন, আমি মরে গেলে দুঃখ ছিল না। আমার সাধের ক্যামেরাটি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ। বড় সুন্দর সুন্দর বিশ-বাইশটা স্ল্যাপ নিয়েছিলাম। যা সম্বল করে ঘরে ফিরতাম-তাই আমার চলে গেল। [জনাব আজিজুল হক চৌধুরী ২০০৩ সালের ৭ই এপ্রিল ঢাকাস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।]
একটু পরে হাশেম ফারুকী ও তাঁর বন্ধু এসে পড়লেন। মাইয়েতসহ ট্রাক আগেই রওয়ানা হয়েছে। তবে গতি অত্যন্ত মন্থর। ট্রাকে রয়েছেন মাওলানার পুত্রগণ-উমর ফারুক, আহমদ ফারুক, মুহাম্মদ ফারুক ও হুসাইন ফারুক। রয়েছেন মিয়া তুফাইল মুহাম্মদ ও অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ। বিদেশীদের মধ্যে ডঃ কারযারী, ডঃ তুতুঞ্জী এবং শেখ মুবারক আল-মুকাওয়া।
যায়লদার পার্কের সংকীর্ণ গলি দিয়ে মাওলানার বাভবনে মাইয়েতসহ ট্রাক যাবে যেখানে দাফন কার্য সমাপন করা হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেখানে যাবে কি করে? তাই শুধু বিশিষ্ট লোককে গলির মধ্যে ঢুকতে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদেশী মেহমান জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং জনাব আলতাফ হাসান কুরায়শীসহ চার-পাঁচ জন সাংবাদিক মাওলানার বাসভবন পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন।
মাওলানার খাস কামরার সামনে একটা উঁচু জায়গায় মাইয়েত রাখা হয়েছে। দু’পাশের বাড়ির বারান্দা ও ছাদের উপরে হাজার হাজার শোকার্ত মেয়ে-পুরুষ তাদের সজল দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে মাইয়েতের উপর। মাওলানার চিরন্তন বাসস্থান তৈরি হতে একটু বাকী। সংকীর্ণ পরিসর হলেও কয়েক হাজার লোক ভিড় করে আছে।
এমন সময় এক অপরূপ অথচ হৃদয়-বিদারক দৃশ্য দেখা গেল। বাড়ির ভেতর থেকে দু’টি কচি শিশু বেরিয়ে মাইয়েতের নিকটে এলো। একজন অপরজনকে বলছে- ওদিকে যেয়ো না দাদাজান ঘুমুচ্ছেন।
অন্যজন বলছে এত লোক এখানে কেন? দাদারজানের যে ঘুম ভেঙ্গে যাবে। এতোগুলো মানুষ রোজ এখানে এলে দাদাজান কাজ করবেন কি করে?
মাসুম বাচ্চাদের মিষ্টি মিষ্টি কথাগুো যাদের কানে পৌঁছল, তারা না কেঁদে পারল না। কচি বাচ্চাদের কত দরদ, কত চিন্তা তাদের প্রিয় দাদাজানের জন্যে। কিন্তু দাদাজান যে তাদেরকে ফেলে চলে গেছেন, দূরে-বহুদূরে-ধরা একটু পরেই সাইয়েদ ও মুরশিদ মওদূদীকে শয়ন করানো হলো তাঁর চিরন্তন শয্যায়। মানব ইতিহাসের একটা উজ্জ্বল অধ্যায়ের যবনিকাপাত হলো। হয়তো আমাদের শ্রুতির অগোচরে ধ্বনিত হলো-
হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে চলো তোমার রবের দিকে এমন অবস্থায় যে, তুমি তোমার পরিণামের জন্যে তুষ্ট এবং তুমি প্রিয়পাত্র তোমার রবের কাছে। অতএব আমার নেক বান্দাহদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও এবং প্রবেশ কর আমার জান্নাতে। (আল-ফজরঃ ২৭-৩০)
শেষের কথাগুলো কিন্তু পরদিন সত্যি সত্যিই নিজ কানে শুনতে পেয়েছিলাম। সকাল ন’টার দিকে গেস্ট হাউজ থেকে গেলাম ৫/এ যায়লদার পার্ক। এটা কোনদিনই ভাবিনি যে, এ স্থানটিতে আসব আর মাওলানাকে দেখতে পাব না- দেখব তাঁর চিরন্তন শয্যাঘর। বুকখানা অব্যক্ত বেদনায় মোচড় দিল। দেখলাম মাওলানার মাজার ঘিরে বিশ-পঁচিশ জন লোক। তাঁদের মাঝে রয়েছেন দেবল শরীফের পীর সায়েব। সকলের হাত উপরে উঠানো দোয়ার জন্যে। পীর সায়েবের মুখে প্রথমে একথাই শুনলাম-
দোয়ার জন্যে হাত উঠানোই রয়েছে এবং তিনি বলেই চলেছেনঃ সাইয়েদ মওদূদী সারা জীবন হক কথা বলেছেন, হকের দাওয়াত দিয়েছেন, হকের উপর শেষ পর্যন্ত অটল ছিলেন। মানুষ টেপ রেকর্ডের মতো। আপনারা যে টেপ রেকর্ডার দেখেন তা মানুষের তৈরি। মানুষ টেপ রেকর্ডার আল্লাহর তৈরি। মানুষের তৈরি টেপ হাসে, কাঁদে, গান গায়, কথা বলে। কিন্তু সাইয়েদ মওদূদী আল্লাহর তৈরি এমন এক টেপ, যা দুনিয়াতেও হক কথা বলেছে, কবরেও চলছে এবং আখেরাতেও বলবে। —–
পীর সায়েব এমনি সব বলেই চলেছেন আর শ্রোতাদের চোখ দিয়ে টস টস করে অশ্রু ঝরছে।
পীর সায়েব দোয়া শেষ করে মুখ ফেরাতেই তাঁকে সালাম মুসাফাহ করলাম। বড্ডো ভাল লাগল তাঁর কথাগুলো। এ ছিল তাঁর আন্তরিক অনুভূতির অভিব্যক্তি।
আমার প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ! আপাতত কিছুক্ষণের জন্যে একটু পেছনে ফিরে যাই। লাহোর থেকে চিকিৎসার জন্যে মাওলানার বিদেশ যাত্রা এবং সেখান থেকে পরপারে যাত্রার কিছু বিবরণ জেনে রাখা দরকার মনে করি।
চিকিৎসার জন্যে মাওলানার বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছার মোটেই ছিল না। হয়তো তিনি স্পষ্টই বুঝেছিলেন যে, চিকিৎসায় কোন লাভ হবে না। কারণ সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু এমন এক ঘটনা ঘটেছিল যা তাঁর বিদেশ যাত্রা তরান্বিত করে। সউদী আরবের বাদশাহ খালিদ তাঁর বিশেষ চিকিৎসক ডাঃ মারুফ দাওয়ালিবিকে পাঠান মাওলানাকে দেখার জন্যে। তিনি মাওলানার সাথে দু’ঘন্টা পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা করেন। আলাপ চলাকালে মাওলানা কাউকে এটা অনুভব করতে দেননি যে, তাঁর স্নায়ুগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তারপর যেই মাত্র ডাঃ দাওয়ালিবি মাওলানার কক্ষ ত্যাগ করলেন মাওলানা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। এ ঘটনাটি সকলকে উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল করে তোলে। ডাঃ আহমদ ফারুক মাওলানাকে চিকিঃসার জন্যে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। কিন্তু বেগম মওদূদী এবং বাড়িসুদ্ধ সকলে মিলেও মাওলানাকে রাজী করানো গেল না। মাওলানা তাঁর পাসপোর্ট গোপনে রেখে দিয়েছেন। সকলেই অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অবশেষে মাওলানার হিসাবরক্ষক জনাব বশীর আহমদ বাট ফন্দিফিকির করে মাওলানার নিকট থেকে পাসপোর্ট হস্তগত করেন। তারপর ২৬ শে মে লাহোর থেকে ইসলামাবাদ এবং ইসলামাবাদ থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে মাওলানা লন্ডন রওয়ানা হন। লন্ডন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন এয়ার মার্শাল আসগর খান। বেগম মওদূদী ও মাওলানার সাথে যান এবং শেষ পর্যন্ত মাওলানার পাশেই ছিলেন।
নিউইয়র্ক থেকে সাড়ে চারশ মাইল দূরে বাফেলো শহরে মিলার ফিলমোর হাসপাতালে অপারেশনের জন্যে মাওলানাকে ভর্তি করানো হয়।
মাওলানার দ্বিতীয় পুত্র আহমদ ফারুক মওদূদী একজন প্রখ্যাত ডাক্তার (ব্রেইন স্পেশালিস্ট) এবং তিনিও এখানে থাকেন। হাসপাতালে ৪ঠা সেপ্টেম্বর মাওলানার অপারেশন হয়। নাড়ীতে ক্ষতের কারণে অপারেশন করতে হয়।
ডাক্তার বলেন, এরূপ অবস্থায় রোগী অসহ্য বেদনা অনুভব করে। কিন্তু মাওলানার তা হয়নি। আগের দিন মাওলানা কথাবার্তা বলতে পারেননি। অপারেশনের পর অবস্থা সন্তোষজনক ছিল। ঐদিন বেলা চারটায় মাওলানার জনৈক বন্ধু ডাঃ আমীরুল্লাহ হুসাইনী তাঁকে দেখতে যান। শরীর কেমন জিজ্ঞেস করলে মাওলানা বলেন যে, তিনি ভালো আছেন। ডাক্তার সাহেব দোয়া করতে বললে মাওলানা কোরআনের নিম্ন দোয়া করেনঃ
*********************************
তুমি আমাকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎ কর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত কর। -সূরা ইউসুফ (১০১)
পরদিন ৫ই সেপ্টেম্বর হৃদরোগের আক্রমণ হয়। আবার সাত তারিখ থেকে স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে থাকে। উনিশ তারিখ আবার হঠাৎ অবনতি ঘটে এবং হৃৎপিণ্ডের ব্যথা খুব বেড়ে যায়। একুশে দিনগত রাতে বেগম মওদূদী অনেক রাত পর্যন্ত স্বামীর শয্যাপাশে বসে সূরায়ে ইয়াসীন ইত্যাদি এবং দোয়া কালাম পড়ে তাঁকে আল্লাহ তায়ালার উপর সোপর্দ করে আসেন।
পরদিন অধিক সময় মাওলানা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কাটান। কিন্তু সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নামাযের সময় তার ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলি উঠানামা করতো- যা সকলেই লক্ষ্য করেছেন। ২২শে সেপ্টেম্বর (১৯৭৯ ইং) সকাল পৌঁনে ন’টায় ৭৬ বছর বয়সে মাওলানা তাঁর প্রকৃত মা’বুদের সাথে মিলিত হন- ইন্না লিল্লাহি ….।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ৪৮ ঘণ্টার আগে হাসপাতাল থেকে মৃতদেহ অপসারিত করা যায় না। সর্বপ্রথম স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ডেথ সার্টিফিকেট দেয়া হয়। তারপর কফিন বাক্স তৈরি হবে। মৃতদেহ রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হবে। তারপর মৃতদেহ অপসারণ করা যাবে। এতে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে। আবার কোন মৃতদেহ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিতে হলেও সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত বলতে হবে যে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আশ্চর্যজনকভাবে এসব কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বিকেল চারটায় হাসপাতাল থেকে বাফেলো শহরের উপকণ্ঠে উইলিং রোডে অবস্থিত ডাঃ ফারুক মওদূদীর বাসস্থানে মাইয়েত স্থানান্তরিত করা হয়। তারপর কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান থেকে মাওলানার সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলিম, নওমুসলিম ও শোকার্ত জনতার ভিড় জমতে থাকে উইলিং রোডে। ২২শে সেপ্টেম্বর বাফেলো শহরে তিনবার নামাযে জানাযা আদায় করা হয়। প্রথমবার নামায পড়ান মাওলানা শরীফ বোখারী, দ্বিতীয়বার টরেন্টোর (কানাডা) কারী সাহেব এবং তৃতীয়বার লাহোর বাগে জিন্নাহ মসজিদের খতীব এবং আঞ্জুমানে খোদ্দামুল কোরআনের সভাপতি ডাঃ ইসরার আহমদ। তাঁরা শিকাগো থেকে বিমান যোগে পৌঁছেন। এই দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত টরেন্টো, নিউইয়র্ক, শিকাগো, ডেট্রয়, মিশিগান, ইন্ডিয়ানা এবং অন্যান্য শহর থেকে অবিরাম লোক আসতে থাকে। ইরানের কাউন্সের জেনারেল সংবাদ পাওয়া মাত্র বাফেলোয় এ স প্রথম জানাযায় শরীক হন। মাইয়েতকে উইলিং রোডে যখন আনা হয়, তখন ডাঃ আহমদ ফারুক, বেগম মওদূদী, মাওলানার জামাই সাইয়েদ মাসউদ এবং বেগম মওদূদীর ভাই উপস্থিত ছিলেন। ডাঃ আহমদ ফারুক তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, “মাওলানা মওদূদী মরহুম যে মিশন নিয়ে সারাজীবন কাটালেন, সে মিশন নিয়ে আমাদের সকলকে সংগ্রাম করে যেতে হবে। আমাদের জন্যে আনন্দের বিষয় এই যে, মাওলানা তাঁর প্রকৃত সম্মানদানকারী আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাযির হয়েছেন। আমরা তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে শুধু পাকিস্তানেই নয় বরং সারা বিশ্বে ইনশাআল্লাহ ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাব।”
ডাঃ আহমদ ইরানের কাউন্সেল জেনারেলকে বলেন, “মাওলানা বলেছিলেন তাঁর স্বাস্থ্য অনুমতি দিলে তিনি নিশ্চয়ই ইরানে যাত্রা বিরতি করে আসতেন। মাওলানা এ কথাও বলেছিলেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমার হৃদয়ের স্পন্দন।”
No comments:
Post a Comment