Thursday, October 22, 2015

ফাঁসীর আদেশে দেশ-বিদেশে প্রতিক্রিয়া

বলা হয়েছে যে, লাহোরের সামরিক আদালত মাওলানা সাঈয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড এবং পরে তা প্রত্যাহার করে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। এ দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে শুধু পাকিস্তানেই নয়, সমগ্র মুসলিম জগতে যে তুমুল বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তার দৃষ্টান্ত অতীত ইতিহাসের পৃষ্ঠায় খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর প্রতি এহেন আচরণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে হরতাল, শোভাযাত্রা, সভা-সমিতি প্রভৃতি শুধু বড় বড় শহর ও রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ রইল না, বরঞ্চ দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শহর ও গ্রামাঞ্চলেও বিক্ষভের অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। নিভৃত পল্লী থেকে বড় বড় শহর পর্যন্ত সকল স্থান থেকে অগণিত টেলিগ্রাম, পত্র ও প্রস্তাবাদির মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দাধ্বনি মুখলিত হতে লাগলো। এই যে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ, এ কোন সাময়িক উত্তেজনা কিংবা ভাবপ্রবণতার বশে প্রদর্শন করা হয়নি। এ ছিল প্রকৃতপক্ষে মাওলানার প্রতি মুসলিম জগতের স্থায়ী শ্রদ্ধার স্বতস্ফুর্ত অভিব্যক্তি। এটি জল বুদবুদের ন্যায় উচ্ছ্বসিত হয়ে হঠাৎ বিলনি হয়ে যায়নি। এ বিক্ষোভ প্রতিবাদ চলেছে অবিরাম পাঁচ মাস ধরে। যারা অতীতে খেলাফত ও কংগ্রেস আন্দোলনের যুগে নানা প্রকার বিক্ষোভ-প্রতিবাদ লক্ষ্য করেছেন, তারাও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, এ ধরনের বিক্ষোভ, আন্তরিক সমবেদনা, শোক ও কাতর ফরিয়াদ ইতঃপূর্বে কখনও দেখা যায়নি।
লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, সাধারণ লৌকিকতা অথবা লোক দেখানোর জন্যে এ বিক্ষোভ করা হয়নি। নীরব রাত্র ও কর্মব্যস্ত দিসের প্রতিটি মুহূর্ত সাক্ষ্য দেয় যে, শুধু পুরুষই নয়, পর্দানশীল মহিলাগণও মর্মাহত, শোকার্ত ও বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। নিশীথ রাতে তাদের তাহাজ্জুদের মুসাল্লা চোখের পানিতে সিক্ত হতো। ইসলামী আন্দোলনের এ মৃত্যুঞ্জয়ী বীরসেনানীর মৃত্যুদণ্ড এবং তারপর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বিশ্ব মুসলিম এক বিরাট ট্রাডেজী মনে করেছিল। সে জন্যে আরব, মিসর, ইরাক, সিরিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের নেতৃবৃন্দ এর তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। সে সব দেশে সংবাদপত্রগুলির সম্পাদকীয় প্রবন্ধে পাকিস্তান সরকারের আচরণের নিন্দা করে মাওলানার আশু মুক্তি দাবি করা হয়।
পকিস্তানে নিম্নলিখিত সংবাদপত্রের সম্পাদকগণও এক স্মারকলিপির মাধ্যমে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেনঃ
করাচীঃ দৈনিক জং, দৈনিক আনজাম, দৈনিক মিল্লাত, টাইমস অব করাচী, দৈনিক ইমরোজ, দৈনিক আল মুন্তাজের, দৈনিক ইকবাল, দৈনিক আসরে জাদীদ, দৈনিক মুসলমান, দৈনিক নয়া রুশনী, দৈনিক শবনম, দৈনিক ওয়াতন, দৈনিক নয়ী সিন্ধ, আল অহীদ, মাকাসেদ, সাপ্তাহিক জাহানে নও, পাক্ষিক নিমকদান, মাসিক ফারান, মাসিক রিয়াজ, মাসিক মুশীর, মাসিক চেরাগে রাহ, পাক্ষিক স্টুডেন্টস ভয়েস, মাসিক কালীম প্রভৃতি।
ঢাকাঃ দৈনিক পাসবান, আজাদ, আংগারা, সিতারা, মর্নিং নিউজ, সাপ্তাজিক আল কায়েদ (ইংরেজী), দি মেইল, সাপ্তাহিক দৈনিক ও নিজামে ইসলাম।
লাহোরঃ দৈনিক পাকিস্তান টাইমস, দৈনিক ইমরোজ, দৈনিক আফাক, দৈনিক নওয়ায়ে ওয়াক্ত, দৈনিক ইহসান, সপ্তাহিক কেন্দিল, দৈনিক হেলালে পাকিস্তান, দৈনিক সাফিনা, সিভিল এন্ড মিলিটারী গেজেট, দৈনিক আসার, মাসিক খাদেদুল হারামাইন, মাসিক আরেফ, মাসিক আল জামেয়া, মাসিক ইসলামিক লাইফ, মাসিক মুসলিম, মাসিক আদাবী দুনিয়া, সাপ্তাহিক ইকদাম, সাপ্তাহিক কারওয়াঁ,
বাহওয়ালপুরঃ ইনসাফ, কায়েনাত, ইলহাম, আল ইমাম, আজম, রাহবার, পরওয়াজ, দেফা, রফীক, নয়া দাওর, কারওয়াঁ, তাবলীগ, নওয়ায়ে বাহওয়ালপুর।
কোরেটাঃ মীযান, পাসবান, নারায়ে হক, মাকাসেদ, হেলাল, খুরশীদ, তর্জুমান রাহবারে নেসওয়ান, বাচ্চুকা শাহীন, টাইমস, মুয়াল্লিম, দুশমন, পুকার, নওয়ায়ে বেলুচিস্তান, নিসওয়ায়ে দুনিয়া, নওয়ায়ে ওয়াতন, পয়গামে জাদীদ, সাদাকাত, কারওয়াঁ তামীরে বেলুচিস্তান।
এতদ্ব্যতীত বিদেশী পত্রিকাগুলোও তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে-
আসসিজল-বাগদাদ, ইখওয়াতে ইসলামীয়া বাগদাদ, আদ্দাওয়াত-কায়রো, মেম্বরশ শর্ক-কায়রো।
ইংল্যান্ডে শিক্ষারত মুসলিম দেশগুলোর ছাত্রবৃন্দ এবং ইংল্যান্ডে প্রবাসী মুসলমানগণ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব মুহাম্মদ আলীর (বগুড়া) নিকটে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে মাওলানার প্রতি মৃত্যুদণ্ডাদেশের জন্য পাকিস্তান সরকারকে সাবধান করে দেন এবং মাওলানার আশু মুক্তি দাবি করেন।
ফিলিস্তীনের মুফতীয়ে আযম আলহাজ্জ মুহাম্মদ আমীনুল হুসাইনী, ইখওয়ানুল মুসলিমুনের মুরশিদ শেখ হাসানুল হাযেমী, জামে আযহারের উকিল মুহাম্মদ আবদুল লতিফ দারায এবং জমিয়তে শাববানুল মুসলিমীনের সভাপতি মুহাম্মদ সালেহ হেরেব, পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর নিকট নিম্নোক্ত মর্মে এক যুক্ত ভারবার্তায় বলেন-
“পাকিস্তানের প্রতি ভালবাসা ও সদিচ্ছা পোষণকারী সকল মুসলমান মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর ফাঁসীর আদেশে মর্মাহত হয়েছেন। আশা করি পাকিস্তান সরকার বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করবেন এবং আমাদের বরেণ্য মওদূদী সাহেবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করবেন।”
ইরানের শিয়া সম্প্রদায়ের মুজতাহেদে আযম হযরতুল ইমাম মুহাম্মদ আল খালেসী এবং ইরাকের আহলে সুন্নাতুল জামায়াতের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা আল্লামা আমযাদ আযযাহাবী নিম্নোক্ত রাষ্ট্রনায়কগণের নিটক এক যুক্ত তার প্রেরণ করে মাওলানা মওদূদীর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারকে চাপ দিতে অনুরোধ করেনঃ
দ্বিতীয় আমীর ফয়সাল-বাগদাদ, সুলতান ইবনে সউদ- সউদী আরব, আল্লামা আয়াতুল্লাহ কাশানী- ইরান, ডাঃ মুসাদ্দেক, ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী- ইরান, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী, মিসরের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল নজীব, শায়কুল আযহার হাসানুল হাযিমী এবং ফিলিস্তীনের মুফতীয়ে আযম। পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর নিকটেও তারা অনুরূপ তার প্রেরণ করেন।
ইন্দোনেশিয়ার মুযাহিদে আযম আল্লামা ঈসা আনসারী ইন্দোনেশিয়ার ষাটটি ইসলামী দলের পক্ষ থেকে বলেনঃ
“মাওলানা মাওদূদী জগতের আমানতস্বরূপ। পাকিস্তানে তাঁর প্রয়োজন না থাকলে ইসলামী জগতে তাঁর প্রয়োজন আছে। আমরা ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান তাঁকে পূর্ণ সমর্থন করি এবং মনে করি যে, আজ মুসলিম জগতে তাঁর চিন্তাধারণার প্রয়োজন আছে।”
এতদ্ব্যতীত পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে মাওলানার মুক্তি দাবি করেন, তাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দীন, মিঃ এম. গাযদার, মিঃ হুসাইন ইমাম, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী, পীর গোলাম মুহাদ্দিদ সিরহিন্দী, মাওলানা আকরাম খাঁ, মাওলানা দীন মুহাম্মদ খান, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং মাওলানা রাগেব আহসানের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
মোটকথা, যে ইসলাম বিরোধী শক্তি মাওলানাকে রাতারাতি খতম করে ইসলামী আন্দোলন বানচাল করতে চেয়েছিল, বিক্ষুব্ধ মুসলিম বিশ্বের রক্তচক্ষুর সামনে তা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো বটে, কিন্তু মাওলানার প্রতি বহুদিনের পুঞ্জীভূতদ বিদ্বেষকে দমন করতে না পেরে তাঁকে চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে সান্ত্বনা লাভের চেষ্টা করলো।

No comments:

Post a Comment