Thursday, October 22, 2015

ফাঁসী কক্ষে মাওলানা মওদূদীঃ ঈমানী মনোবলের প্রত্যক্ষ্য সাক্ষী

মর্দে মুমিন যখন দীন-দুনিয়ার বাদশাহ আল্লাহর দরবারে নতশির, ইবাদতে মশগুল, তখন তাঁকে জানানো হলো মৃত্যুর পরওয়ানা। মৃত্যুদণ্ডাদেশে আল্লাহর পিয়ারা বান্দার চোখে -মুখে নেই কোন ভীতির চিহ্ন, নেই কোন উদ্বেগ। অম্লান বদনে হাসিমুখে ফাঁসীর আদেশ মেনে নিলেন ধন্যবাদের সাথে।
জনৈক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। “কাদিয়ানী সমস্যা” পুস্তকখানার প্রকাশক ও মুদ্রাকর জনাব সাইয়েদ নকী আলী বলেন-
‍”আটই মে দেওয়ানী ঘরের প্রাচীন টেনিসকোর্টে আমরা মাগরিবের নামায পড়ছিলাম। মাওলানা ছিলেন ইমাম। মুক্তাদীদের মধ্যে জেলের নম্বরদার এবং বাবুর্চি ব্যতিরেকে আমরা ছিলাম পাঁচজন-মিঞা তোফাইল মুহাম্মদ, মাওলানা আমীন আহ্সান ইসলাহী, মালিক নসরুল্লাহ খান আজিজ, চৌধুরী মুহাম্মদ আকবর এবং আমি। আমরা যখন দ্বিতীয় রাকআতে, তখন হঠাৎ দরজা খুলে গেল এবং তারপর শোনা গেল কয়েকজনের পদধ্বনি। কিছু ফিসফাস এবং প্রত্যাবর্তনের শব্দ।
সুন্নাতের সালাম ফিরাত না ফিরাতে আবার শোনা গেল খটাখট। কয়েকজন সৈনিক এবং জেলখানার কর্মচারীকে ভিতরে আসতে দেখা গেল। একজন বললেন, মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী কে?
মাওলানা শান্তকণ্ঠে বললেন- এই যে আমি, বলুন।
সরকারী কর্মচারী- তাসনীম সংবাদপত্রে দু’টি বিবৃতি প্রকাশের জন্যে আপনার সাত বছর সশ্রম কারাবাস এবং মালিক নসরুল্লাহ খান আজিজের তিন বছর। উভয়ে প্রত্যুত্তরে, “আচ্ছা ঠিক আছে” বলে নীরব রইলেন।
কর্মচারী পুনরায় বললেন-  “কাদিয়ানী সমস্যা” পুস্তক প্রণয়নের জন্যে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর মৃত্যুদণ্ড এবং তার মুদ্রাকার সাইয়েদ নকী আলীর নয় বছর সশ্রম কারাদণ্ড।
আমরা উভয়ে ‍”আচ্ছা ধন্যবাদ” বলে চুপ করে রইলাম।
মাওলানার মৃত্যুদণ্ড ছিল একবারে অপ্রত্যাশিত। তবু কারও মুখে ছিল না কোন উদ্বেগ। তবে মন চিন্তা-ভাবনায় ভরে গেল। আমরা সকলে তাকালাম মাওলানার দিকে। দেখলাম তাঁর ধীর ওরশান্ত মূর্তি। দৃষ্টিতে বিরাট গভীরতা যেন গহীন সমুদ্রের অসীম গভীরতা।
কর্মচারী মাওলানার হাতে এক টুকরো কাগজ দিয়ে বললেন-
মাওলানা, আপনি ইচ্ছা করলে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন।
মাওলানা নীরবে মৃদু হাস্য সহকারে কাগজটুকু হাতে নিলেন। কর্মচারী বিদায়ের সময় বলে গেলেন-
– মাওলানা প্রস্তুত হোক আপনাকে একটু পরেই যেতে হবে।
– কোথায়?
– ফাঁসীর কুঠুরিতে।
– আমি তৈরি আছি।
অতঃপর আমরা নীরবে দেওয়ানী ঘরের কামরার দিকে চললাম। যেতে যেতে কর্মচারীকে বলতে শোনা গেল-
মালিক নসরুল্লাহ খান আজিজ এবং সাইয়েদ নকী আলী আপনাদেরও যেতে হবে। কিন্তু, আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনাদেরকাল সকালে নিয়ে যাব।
আমি এবং মালিক সাহেব যেন শুনেও শুনলাম না। কারণ মাওলানার মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ আমাদের এত শোকাভিভূত করেছিল যে, অন্য কোন দিকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল না।
দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে সত্যপথের পথিকদের কতই না লাঞ্ছনা, কতই না নির্যাতন নিপীড়ন। আমরা সকলে দ্বীনে হকের নগণ্য খাদেম, সত্যপথের সংগ্রামী পুরুষদের সমপাংক্তেয় হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। অপরাধ? কাদিয়ানী সমস্যা বই প্রকাশের অপরাধ? এ তো শুধু দুনিয়াকে প্রতারণা করার জন্যে বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের অপরাধ হচ্ছে এই যে, আমরা পাকিস্তানে জাতি ও সরকারের যুক্ত শক্তিকে ইসলামের জন্য ব্যবহার করতে চাই। আল্লাহর দ্বীন কায়েম করাই আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য করে নিয়েছি। শুধুমাত্র এই ছিল আমাদের অপরাধ।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। মাওলানাকে সত্যি সত্যিই ফাঁসীকক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এমন মনীষী যিনি শুধু পাক ভারতেই নন, সমগ্র আরব জগতেও বিরাট শ্রদ্ধার পাত্র আজ ফাঁসীকক্ষে? আমি ভাবছিলাম, একি সত্যি?
ইসলামী আন্দোলনের বীর মুজাহিদকে আজ ফাঁসী কাষ্ঠে ঝুলান হবে? জাতির মুঢ় পরিচালকগণ, যারা তাদের নির্বুদ্ধিতার কারণে পাকিস্তানে ইসলামের জয়জয়কার দেখতে চায় না- আজ এই পদক্ষেপ করতে চলেছে?
সত্যিই কি ইসলামী আন্দোলন তার শৈশবেই এই মহান ব্যক্তিত্ব থেকে বঞ্চিত হবে?
মাওলানার ধীর গম্ভীর স্পষ্ট উক্তি আমার কর্ণকুহরে ঝংকৃত হতে লাগল- আপনারা মনে রাখবেন যে, আমি কোন অপরাধ করিনি। আমি তাদের কাছে কিছুতেই প্রাণ ভিক্ষা চাইব না। এমন কি আমার পক্ষ থেকে অন্য কেউ যেন প্রাণ ভিক্ষা না চায়- না আমার মা, না আমার ভাই, না আমার স্ত্রী-পুত্র পরিজন। জামায়াতের লোকদের কাছেও আমার এই নিবেদন।
মিঞা তোফাইল মুহাম্মদ সাহেব মাওলানার হোল্ড অল খুলে বিছয়ে দিলেন। আমরা সকলে মিলে তার মধ্যে জিনিসপত্র ভরতে লাগলাম। চামড়ার সুইকেটা মাওলানা এবং আমি সাজিয়ে ফেললাম। কারণ এ সবই মাওলানার বাড়ীতে ফেরত পাঠাতে হবে।
এদিকে একটা ছোট্ট বিছানা মাওলানার সঙ্গে ফাঁসীকক্ষে পাঠাবার জন্যে তৈরি করা হলো। একটা কাপড়ে বাঁধা খানা, কোরআন মজীদ এবং লোটা-গ্লাসও এসবের সঙ্গে দেয়া হলো।
আমার মুখে কথা ছিল না। হৃদয় কাঁপছিল। হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে আসছিল। মাওলানার মৃত্যুদণ্ডের ধারণা যেন ইলেকট্রিসিটির মতো শরীরের অণু-পরমাণুতে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়ছিল। তোফাইল সাহেবের অবস্থাও ছিল ঠিক এমনি। মালিক নসরুল্লাহ খান আজিজ তাঁর ভাব-গম্ভীর মূর্তি নিয়ে পায়চারী করছিলেন এবং তাঁর মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে দোয়াও বেরুচ্ছিল। আমাদের সবার বয়োজ্যেষ্ঠ চৌধুরী মুহাম্মদ আকবর সাহেবের অবস্থা ছিল আজিব। তিনি শুধু দাঁড়িয়েছিলেন নির্বাক নিস্তব্ধ হয়ে। ইসলামী সাহেব কখনও পায়চারী করছেন, কখনও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। তাঁর দমিত আবেগ-উচ্ছ্বাস রক্তবর্ণ ধারণ করে মুখমণ্ডলে পরিস্ফুট হয়ে পড়ছিল।
বিছানাপত্র বাঁধতে বাঁধতে মনকে শক্ত করে একবার বলে ফেললাম-
– মাওলানা, প্রাণভিক্ষা না করার সিদ্ধান্ত তো আপনার নিজস্ব। এ সিদ্ধান্ত জামায়াতকে মেনে নিতে হবে তার কোন মানেই নেই। জামায়াতের লোক বাইরের অবস্থা বিবেচনা করে যা সিদ্ধান্ত করবে তা আপনাকে মানতেই হবে।
মাওলানা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বললেন-
আমি জামায়াতের দৃষ্টিতেও আমার এ সিদ্ধান্ত সঠিক মনে করি। আমার এ সিদ্ধান্ত জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে জানিয়ে দেয়া আপনাদের কর্তব্য।
এর মধ্যে জেল কর্মচারী এসে পড়ল। আমাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শান্ত, যেমন ঝড়ের প্রাক্কালে সমুদ্র থাকে শান্ত-শিষ্ঠ।
কিন্তু মাওলানা? ইসলামী আন্দোলন ও সত্য পথের বীর সেনানী, যাঁকে শাহাদতের মর্যাদা দানের ঘোষণা করা হয়েছে, সেই মাওলানা একেবারে শান্ত, ধীর-স্থির, অবিচল।
মাওলানা আমাদের সকলের সাথে বুক ভরে কোলাকুলি করলেন। তা ছিল এমন আন্তরিক যে, চিরদিন মনে থাকবে।
জিনিসপত্র কিছুটা আমরা নিলাম এবং কিছুটা জেলের নম্বরদার। কামরা থেকে বেরিয়ে দেওয়ানী ঘরের দরজা পর্যন্ত গিয়ে মাওলানাকে বিদায় দিলাম। এবার বুকের মধ্যে জমাট বাঁধা তুফান আত্মপ্রকাশ করল। মিঞা তোফাইল সাহেব এবং আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম এবং আমি ফিরে এসে জায়নামাযে সিজদায় পড়ে গেলাম।
ইসলাহী সাহেব, মালিক সাহেব এবং চৌধুরী সাহেব আগে থেকেই সিজদায় পড়েছিলেন।
আমরা সকলে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে লাগলাম। কান্নার বেগ অপ্রতিহত, অশ্রু জোয়ার উদ্দাম, অফুরন্ত।
এভাবে কতক্ষণ কাটালাম জানি না। হঠাৎ নম্বরদারের কঠোর পদধ্বনি তার দিকে আমাদের সৃষ্টি আকৃষ্ট করল। দেখি, মাওলানার কাপড়, খাবার, বাসন, জুতা প্রভৃতি ফেরত এনেছে। কোরআন শরীফখানাও ফেরত এনেছে। কারণ ফাঁসীর কুঠুরিতে কোরআন শরীফ রাখার কোন স্থান নেই।
মাওলানা ইসলাহী সাহেব মাওলানার কাপড় আমার হাত থেকে নিয়ে বার বার চুমো দিতে লাগলেন, চোখে ও বুকে তার মধুর স্পর্শ উপভোগ করতে লাগলেন। কারণ এ কাপড় ছিল আল্লাহর পথে মুজাহিদের, যনি ছিলেন ফাঁসকিক্ষে আবদ্ধ, শাহাদাতের অমৃতপানের প্রতীক্ষায়।
মিয়া তোফাইল সাহেব মাওলানা ইসলাহীর হাত থেকে সে কাপড় নিয়ে মুখে-চোখে-বুকে লাগাতে থাকলেন। আমাদের সকলেরই অশ্রুজলে সে কাপড় সিক্ত হয়ে পড়ল।
তাঁর জন্যে আমাদের এই যে প্রাণঢালা ভালবাসা তা কিসের জন্যে?
– তিনি কি আমাদের কোন আত্মীয় ছিলেন?
– তাঁর সাথে আমাদের কি কোন বংশীয় সম্পর্ক ছিল?
– এ প্রেম ভালোবাসা কি এক বর্ণ-গোত্র হওয়ার কারণে?
– এ কি ছিল একই দেশের অধিবাসী হওয়ার জন্যে?
– না, না, শুধু এই কারণে যে, তিনি আল্লাহর পথে প্রাণ বিসর্জন দিতে চলেছেন। শুধু ইসলামের সম্পর্কই আমাদের ভালবাসাকে করেছিল এতখানি ঐতিহাসিক ও নিঃস্বার্থ।
মাওলানার সীমাহীন খোদাপ্রেম এবং খোদার পথে প্রাণ উৎসর্গ করার আকুল আগ্রহ জগতকে করল স্তম্ভিত। জেলখানার কর্মচারীদেরকেও করল বিস্ময়-বিমুগ্ধ এবং রেখে গেল ইসলামের ইতিহাসে এক পরম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ফাঁসীকক্ষে মাওলানাকে পরতে দেয়া হলো ইজারবন্দবিহীন পায়জামা। মাওলানা নম্বরদারকে জিজ্ঞেস করলেন-
“ভাই, ইজারবন্দ দিতে ভুলে গেছ।”
নম্বরদার বললে-
“মাওলানা, ফাঁসীর আসামীকে ইজারবন্দ দেয়া হয় না। কারণ যদি সে তাই দিয়ে আত্মহত্যা করে বসে?”
মাওলানা মৃদু হাস্য সহকারে বলেন-
“আরে যে প্রাণভরে শাহাদাতের জাম পান করতে যাচ্ছে, সে কি এমনই নির্বোধ যে, আত্মহত্যা করে জাহান্নামে যাবে?”
ফাঁসীকক্ষে মাওলানার কোন উদ্বেগ নেই। প্রাণনাশের জন্যে কোন চিন্তা-ভাবনা নেই। মুখে- চোখে কালিমার কোন চিহ্ন নেই। কোরআন শরীফের পবিরর্তে সাইয়েদ আহমদ শহীদের (রঃ) জীবনী পড়তে পড়তে অতি স্বাভাবিক পরম সুখে নিদ্রা গেলেন। স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁর আপন গৃহের নিদ্রা আর ফাঁসীকক্ষের নিদ্রায় কোন পার্থক্য সূচিত হলো না।
মাওলানার এ সময়ের আর একটি অমূল্য বাণী এই যে, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অগণিত ভক্ত-অনুরক্ত ফাঁসীর আদেশে অধীর হয়ে পড়লে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন-
“জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা আসমানে হয়, যমীনে হয় না।”
কি দৃঢ় প্রত্যয়! কি অটুট মনোবল?
ফাঁসীকক্ষে মাওলানার অবস্থা মাওলানার মুখে শুনুন। মাওলানাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-
দেওয়ানী ঘরের পরিবেষ্টনীর মধ্যে যখন আমাকে ফাঁসীর আদেশ শুনান হলো এবং সাথে সাথে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রাণভিক্ষার অধিকারও দেয়া হলো, তখন আমার মনের মধ্যে তিন প্রকার ধারণার উদয় হলো।
প্রথমটি এই যে, জালিমের কাছে করুণাপ্রার্থী হওয়া আমার আত্মমর্যাদার পরিপন্থী।
দ্বিতীয় এই যে, কিসের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী হবো? এজন্যে কি যে, আমাকে কেন জান্নাতে পাঠান হচ্ছে? এটা সত্য কথা যে, সারা জীবন দ্বীনের খেদমত করে অন্যভাবে মৃত্যুবরণ করাতে বেহেশত লাভের ততটা নিশ্চয়তা নেই, যতটা আছে শাহাদত বরণ করে। অতএব আমি কি একথা বলব যে, আমাকে জান্নাত থেকে মুক্তি দাও?
তৃতীয় কথা এই যে, আমার মতো লোক যদি আজ প্রাণভিক্ষা করে, তাহলে এদেশের সাধারণ লোকের মন থেকে মর্যাদাবোধ মুছে যাবে।
অতএব, আমি আমার বন্ধু-বান্ধবদের একথা কঠোর চাপ দিয়ে বলে দিলাম আমার বাড়ীর কোন লোক, অথবা জামায়াতের কোন লোক আমার পক্ষ থেকে যেন ক্ষমাপ্রার্থী না হয়। নতুবা আমি কোনদিন তাদের ক্ষমা করব না।
যখন আমাকে ফাঁসীর কুঠরিতে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমাকে আবশ্যকীয় সকল দ্রব্যাদি থেকে বঞ্চিত করা হলো। আমার সবকিছু কেড়ে নেয়া হলো। এমনকি আমার পরিধেয় বস্ত্রও কেড়ে নিয়ে জেলের বস্ত্র দেয়া হলো। ইজারবন্দবিহীন পায়জামা দেয়া হলো। তা দেখে প্রথমত মনে করলাম যে, হয়ত ভুলে ইজারবন্দ দেয়নি। কিন্তু জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে, ইজারবন্দ মোটেই দেয়া হয় না। কারণ কয়েদী নৈরাশ্যে যদি তা দিয়ে আত্মহত্যা করে বসে। বাধ্য হয়ে পায়জামার সামনের দুই মাথা একত্রে করে পরতে হলো। কিন্তু তা সতর ঢাকার উপযোগী হলো না এবং নামায পড়তে বড়ই অসুবিধা হতে লাগল। কোরআন শরীফ প্রথমত সঙ্গে রাখতে চাইলাম, কিন্তু যখন দেখলাম যে, শোবার মেঝে ছাড়া তা রাখবার কোন স্থান নেই, তখন ফেরত দিলাম। যা হৃদয়ে গাঁথা ছিল তাই সংগে রয়ে গেল।
যা হোক, সবাই চলে যাওয়ার পর এক নম্বরদার (Warder) এলো এবং সরকার ও মন্ত্রীদের প্রাণভরে গালাগালি করলো। এরপরে এলো দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ। প্রত্যেকেই সরকারকে অভিসম্পাত করে গেল।
রাতের বেলায় ফাঁসীর কুঠরিতে এত চিৎকার আর্তনাদ শুরু হলো যে রাত দু’টোর আগে ঘুম এলো না। কেউ কোন পীর বুযুর্গের নাম ধরে ডাকছে। কেউ বা কবিতা আওড়াচ্ছে এবং কেউ বিড়বিড় করে বকেই চলেছে- ‘মাওলা বাঁচাও, মাওলা বাঁচাও’।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্পর্কে মাওলানার কি ধারণা ছিল তা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-
আমার এই ধারণা ছিল যে, যদি জনসাধারণের পক্ষ থেকে বিরাট বিক্ষোভ করা না হয়, তাহলে সরকারের যা মনোভাব, তাতে তারা ফাঁসী দিয়েই ফেলবে। যদি তারা এ পদক্ষেপ করার সুযোগ পায়, তাহলে তা হবে অত্যন্ত মারাত্মক। এরপর এদেশে দ্বীনের কাজ বহুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু জনসাধারণ যদি সচেতন হয়ে কাজ করে এবং সরকারকে যদি একবার পিছপা হতে হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ তাদেরকে পিছনে হঠতেই হবে এবং ইসলামী আন্দোলনের পথকে রুদ্ধ করা সম্ভব হবে না। এ সময়টা হচ্ছে সারাদেশের জন্য এক বিরাট অগ্নি পরীক্ষার সময়।
দ্বিতীয় দিন শেখ সুলতান আহমদ এবং সফদর সাহেব ছেলেদের নিয়ে দেখা করতে এলেন। তারা আবার আমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষার কথা বললেন। আমি তাদের শাসিয়ে বললাম, যেন তারা কিছুতেই ক্ষমাপ্রার্থী না হন।
অতঃপর মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী এলেন। তিনিও ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে তার নিজের খেদমত পেশ করতে চাইলেন। তাঁকে আমি বললাম যে, একথা কিছুতই আমার মাথায় ঢুকছে না।
মাওলানাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ফাঁসীর কুঠরিতে বিশেষ ধরনের কষ্ট ছিল না। তার উত্তরে মাওলানা বলেন-
একে তো সেই পরিধেয় বস্ত্র ছিল অসঙ্গত ও অপর্যাপ্ত এবং চিৎকার হট্টগোল। দ্বিতীয়-অসুবিধা এই যে, ফাঁসীকক্ষের গঠনটাই সকল মৌসুমে কয়েদীদের জন্য কষ্টদায়ক ছিল। আলো-বাতাসহীন সংকীর্ণ কক্ষ। রোদ, বৃষ্টি, শীত, গ্রীষ্ম থেকে আত্মরক্ষার উপায় নেই। তদুপরি ফাঁসীর কুঠরিতে আহার দেয়া হয় সি-ক্লাসের- যা একবারে অখাদ্য।
তৃতীয় দিনে প্রায় বেলা দু’টার সময় একজন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে বললেন, “মাওলানা আপনাকে মুবারকবাদ জানাই, আপনার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ হয়েছে।” তারপর এ সংবাদ দিতে দলে দলে লোক আসতে লাগলো। এর কিছু পরে মাওলানা নিয়াজী এবং আমাকে সেখান থেকে বের করে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া হলো।

No comments:

Post a Comment